Posts Tagged ‘mamata’

A Fraud Party Full Of Fraud Leaders

April 28, 2016

409350

Advertisements

Fight For Rice, Meat; And Mamata

November 6, 2015

ভাতের লড়াই, মাংসের কাজিয়া এবং মমতা

চন্দন দাস

মিড ডে মিলে মাংস দেওয়া হয় না। ডিম দেওয়া হয়। সাধারণত একদিন।ডিম কার? কে দিয়েছে? এ’ নিয়ে কাজিয়া বাধানোর অবকাশ নেই। কারণ পাখির সঙ্গে দেশপ্রেমের সরাসরি সংযোগ সংক্রান্ত কোনও নিদান নেই।

আগামী দিনে মিড ডে মিলে আদৌ ভাত দেওয়া যাবে কিনা, শিশুরা আর পড়তে আসতে পারবে কিনা নিদারুণ আর্থিক সঙ্কট ডিঙিয়ে — এই প্রশ্ন ক্রমাগত সক্রিয় হয়ে উঠছে দেশে এবং রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে অনেক শিশু শিক্ষাকেন্দ্র, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সামনে। তবু ভাত নিয়ে, চাল নিয়ে, ‘ভাতের কারখানা’ নিয়ে মাথাব্যথা বিশেষ কারও নেই। ভাতের সঙ্গে কী দেশপ্রেম, নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই?

থাকার কথা। কে কত বড় দেশপ্রেমিক ঠিক করা উচিত, কে দেশের গরিবের জন্য কত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে তার উপর। কিন্তু তা হয়নি গত ৬৮ বছরে। দেশপ্রেমের ঠিকাদাররা এখন মাংসের মানদণ্ডে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর দেশপ্রেমের দিনমজুররা ভাতের লড়াইটা পৌঁছে দিচ্ছেন, দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন আজও। তা সে বর্ধমানে হোক, জঙ্গলমহলে হোক কিংবা চা বাগানে — ছবি একই। মাংসের কাজিয়া মূলত সেই ভাতের লড়াইকে ভুল দিকে ঘুরিয়ে দিতে।

দেশপ্রেমের দিনমজুর…

সাভারকারের সঙ্গে আমাদের লড়াই অনেকদিনের। ১৯২৫-এ আরএসএস-র জন্ম। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯২০-তে। সাভারকার ভারতে ‘হিন্দুত্ব’ ভাবনার স্থপতি। তিনি সেলুলার জেলে ছিলেন। গণেশ ঘোষও। সাভারকার জেল থেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়েছিলেন। গণেশ ঘোষরা অবশ্য সেখান থেকেই, বিস্তর কষ্ট সহ্য করে কমিউনিস্ট হওয়ার রাস্তা তৈরি করেন। সাভারকারের ভাবশিষ্যরা এখন ঠিক করছে কে দেশপ্রেমিক, আর কে পাকিস্তানি। আর গণেশ ঘোষের উত্তরসূরিরা এখনও পদাতিক, দেশপ্রেমের দিনমজুর। রাষ্ট্র তাঁদের দেখে না। মোটা মাইনে দেয় না। কিন্তু দেশবাসীর ভাত, মোটা কাপড়, কাজ, এতটুকু ছাদের লড়াইটা এখনও, বিস্তর রক্তপাতের পরেও লড়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এ’ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ’ লড়াই জিততে হবে — স্লোগানটা বস্তাপচা হয়নি। এখনও লাল পতাকা মানে এটাই।

সাক্ষী, প্রমাণ জঙ্গলমহলে। ২৩টি ব্লক। ২০০১-র ২৩শে জানুয়ারি থেকে ২০১১-র ৩০ শে নভেম্বর — সময়কাল মাত্র ১০ বছর ১০ মাস। মানে ১৩০ মাস। আর এই সময়ে জঙ্গলমহলে ২৭৫ জন শহীদ হয়েছেন। নির্দিষ্ট একটি এলাকায়। তাঁদের মধ্যে পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আছেন। আবার নেহাতই স্কুলছাত্র — তিনিও আছেন। অসমসাহসী মহিলা আছেন। সংখ্যালঘু আছেন। আদিবাসী তো আছেনই। সবচেয়ে বড় কথা — খেতমজুর আছেন অনেকে। গরিব কৃষক, ছোট ব্যবসায়ীও আছেন শহীদ তালিকায়।

তারপরও টিকে আছে পার্টি। সিপিআই(এম)। ‘টিকে থাকা’ শব্দটির মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব অনুরণিত হয়? তাই না। আসলে এতজন সংগঠককে হারিয়ে হাঁটু মুড়ে, দুমরে মুচড়ে পড়ে যাওয়ার কথা। কোথাও কোথাও মিশে যাওয়ার কথা লালমাটির সঙ্গে। লোধাশুলির অফিস বিস্ফোরণে উড়ে যেতে পারে। সে তো ইঁট, কাঠ, কংক্রিটের। কিন্তু জান আছে দেশপ্রেমের ধারণায়। দেশপ্রেম মানে মানুষ। তাই সিপিআই(এম)-র নেতা, কর্মী, সমর্থকদের গুলি ঝাঁঝরা করা মাওবাদী নেত্রী যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেতার সুখী ঘরণীর জীবন কাটাচ্ছেন, তখনও, সেই ‘বিপ্লবী’দের ভয় জাগানো আঁকা বাঁকা মেঠো পথে প্রচার চালাচ্ছে সিপিআই(এম)।

জঙ্গলমহলে রেগার জবকার্ড আছে ৬লক্ষ ২৭ হাজার ৪০১টি পরিবারের। আর কাজ পেয়েছেন চলতি বছরে ৩৬ হাজার ৮০টি পরিবার। শতাংশের হিসাব করলে রাষ্ট্র, সরকারের লজ্জায় মাথা হেঁট হওয়া উচিত। নতুন ধানের দাম বস্তা(৬০ কেজি) ৫৫০ টাকা। নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক। আর ৩০ কেজি বীজধানের দাম ১২০০টাকা। প্রতিটি ব্লকে কিষান বাজারের প্রতিশ্রুতি ছিল। সব ব্লকে হয়নি। যে কটি ব্লকে হয়েছে, সেগুলির ভবনগুলি শুধু দাঁড়িয়ে আছে। কৃষক সেখানে যান না। সেখানে কোনও কেনাবেচার দেখা নেই। গোয়ালতোড়ে ১০০০ একর জমিতে শিল্পের ঘোষণা এখনও প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে রয়েছে। জঙ্গলমহলের জন্য পৃথক এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কের ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেটি হয়নি। ল্যাম্পস যা ছিল আদিবাসীদের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম, সেগুলি এখন ধুঁকছে। গ্রামগুলিতে কর্জ, দাদনে জর্জরিত কৃষক ক্রমাগত মহাজনের দেনা-চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে রেগার মজুরি চাই, কাজ কোথায়, শিল্পের কী হলো, কেন ফসলের দাম পাচ্ছি না, এত যে প্রতিশ্রুতি দিলে তার কী হলো — নানা দাবি ধূমায়িত। আবার সভা, মিছিল দেখা যাচ্ছে জোরালো। প্রতিটি ব্লকে জমায়েত হয়েছে এই সময়ে। পুলিশের সাধ্য কী তাকে আটকায়? ডেপুটেশন দিচ্ছেন গ্রামবাসীরা — সামনে পার্টির নেতা, কর্মীরা। সেই চেনা ঝান্ডা। শহীদদের পতাকা।

শিলদায় দেখা হলেই অনন্ত বলতো —‘‘শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবো।’’ কমরেড অনন্ত মুখার্জি নেই। তাতে কী? এই হেমন্তেও ‘অনন্তরা’ থেমে নেই।

দেশে এমন উদাহরণ আছে? না। বিদেশে? হাতে গোনা যাবে।

ভয়ও হেরে যায়, রাস্তা ছেড়ে দেয় নতজানু হয়ে — এমন পার্টি দেশে একটিই আছে। কবিতা মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে বান এসেছে হৃৎকমলের সুবর্ণরেখায়? মোটেও না।

আমি হাজারও ঋত্বিক দেখেছিলাম। হাজারও ঋত্বিক দেখছি। দেশপ্রেমের পদাতিক তো তাঁরাই। তাই ভরসা থাকুক তাঁদের উপর। নজর থাকুক সামনে। জোয়ার আসছে কাঁসাইয়ে।

অপেক্ষাকে যত্ন করুন।

মাংসের কাজিয়া, মুখ্যমন্ত্রীর নীরবতা..

চা বাগানে ঠিক মত খাওয়াই জুটছে না। অনাহারে মারা যাচ্ছেন বন্ধ বাগানের শ্রমিক পরিবার। জঙ্গলমহলে কাজ নেই। রেগার মজুরি জুটছে না রাজ্যের কোনও জেলায়। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমে ধান পুড়ে খাক। অন্যত্র ধানের দাম নেই। আলুর দাম নেই। বাকি সব ফসলের একই হাল। ঠিক এখন, এই পশ্চিমবঙ্গে মাংসের চরিত্র নির্ধারণের সময় নেই বেশিরভাগের। দেশের অবস্থাও প্রায় এক। এ’ কথা ঠিক যে, দেশের অন্য কোনও রাজ্যেই এমন রাজ্য সরকার নেই। উৎসবের বিলাসিতায়, ঘোষণা-প্রতিশ্রুতির ভেলায় ভেসে চলা এমন রাজ্য প্রশাসন দেশে বেনজির। প্রতিবাদী আক্রান্ত হবেই, নির্ঘাৎ হবে — এমন নিশ্চয়তা দেশের প্রায় কোনও রাজ্যে নেই। চুরির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রীর ‘পাশে থাকার’ পোস্টার সাঁটিয়ে অবলীলায় স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ছুটে চলা অটো দেশের কোথাও মিলবে না। আর এখানেই রাজ্য সরকারের অগণতন্ত্র, ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজপথের লড়াইয়ে এত রক্তক্ষরণ, তীব্রতা সাম্প্রতিককালে দেশের আর কোথাও মেলেনি।

মোদীর হাতে দেশ বিপন্ন। মমতা ব্যানার্জির সরকারই বেসামাল।

কতটা বেসামাল তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার মুখ্যমন্ত্রী নিজে বুঝিয়ে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ সফরে। শিল্পপতিদের হাত জড়ো করে অনুনয়, বিনয় করেছেন বিনিয়োগের জন্য। অথচ ২০০৬-০৭-এ কী নিদারুণ ‘বীরত্ব’ আমরা দেখেছিলাম তাঁর মধ্যে। সিঙ্গুর সাক্ষী। কাটোয়া সাক্ষী। ভাঙড় সাক্ষী। সাক্ষী আরও অনেক জায়গা, যেখানে বামফ্রন্টের সরকার শিল্পের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন, নন্দীগ্রামের এক সভায় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী বলেছিলেন,‘‘ভাতের কারখানা ধ্বংস করে মোটর গাড়ির কারখানা/ সে হবে না, সে হবে না।’’ ‘কৃষক-দরদী’ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা সেই ছড়াকে নিজেদের উত্থানের রিং টোন করে ফেলেছিলেন।

এখন রাজ্যে বিনিয়োগের দেখা নেই। আর ‘ভাতের কারখানা’, অর্থাৎ খেতখামারের অবস্থা গত আটত্রিশ বছরের সবচেয়ে দুরবস্থার মুখোমুখি। একশোর বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ১৪১০ টাকা কুইন্টাল প্রতি হলেও, রাজ্যের কোথাও কুইন্টাল প্রতি ৯০০-৯৫০ টাকা ধানের দাম কৃষকরা পাচ্ছেন না। আসলে ভাতের কারখানা আর মোটর গাড়ির কারখানার একটি গভীর যোগাযোগ ছিল, যা মমতা ব্যানার্জি কিছুতেই রাজ্যের মানুষ বুঝে ফেলুন, তা চাননি। তাই কখনও মাওবাদী, কখনও আরএসএস, কখনও জামাতের সঙ্গে মিলে রাজ্য জুড়ে নৈরাজ্য তৈরি করেছিলেন।

বামফ্রন্ট সংবেদনশীল ছিল। অনেকে তাকে দুর্বলতা ভেবেছিল। আর সেই নৈরাজ্যের ফল এখন মিলছে। শিল্প গত। ভাতের কারখানাও পতিত হতে বসেছে। এমন সময়ে মাংসের কাজিয়া নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করে কঠোর সমালোচনা করেন? দেশের নানা পর্যায়ের মানুষ প্রতিবাদ করছেন। বামপন্থীরা তো হিন্দুত্ববাদীদের পয়লা নম্বর দুশমন। তাঁরা তো প্রতিবাদে সোচ্চার হবেনই। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি বিলকুল চুপ। এই নীরবতা সন্দেহজনক। কিন্তু একেবারে বোঝা যাচ্ছে না নীরবতার কারণ, তা নয়। ‘মাংসের কারবারিরা’ই তাঁকে আবার রক্ষা করতে পারে, সেই অঙ্ক করে ফেলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর অনেক দিনের পুরোন বন্ধুরা আছেন এই মাংসের পরিচয়পত্র তৈরির কাজে।

বাঁটোয়ারাপন্থীরা বাড়ছে…

মাংস কার? গোরুর না মোষের? নাকি পাঁঠার? নাকি মুরগি, হাঁসের মাংস খাওয়া উচিত? বিতর্কের বল গড়াতে গড়াতে শেষ পর্যন্ত ‘দেশপ্রেমে’ পৌঁছে গেছে। কে পাকিস্তানি, কে ভারতীয় — ঠিক করছে মমতা ব্যানার্জির ‘দেশপ্রেমিকরা’। অর্থাৎ আরএসএস, সঙ্ঘ পরিবার। ২০০৩-র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আরএসএস-র সভায় হাজির হয়ে আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন,‘‘আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমরা জানি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন।’’ সেই আরএসএস ‘দেশপ্রেমের’ শংসাপত্র দিচ্ছে। কার কার পাকিস্তানে যাওয়া উচিত, তাও ঠিক করে দিচ্ছে। এদের কাছে মমতা ব্যানার্জি কমিউনিস্টদের সরানোর জন্য সহায়তা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন,‘‘যদি আপনারা(আরএসএস) ১শতাংশও সহায়তা করেন আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।’’ আরএসএস সেদিন তাঁকে ‘সাক্ষাৎ দূর্গা’ বলে অভিহিত করেছিল।

সেই আরএসএস-র ‘মাংস বিতর্ক’ এবং দেশপ্রেমের অপপ্রচার মমতা ব্যানার্জিকে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সহায়তা করবে, এমনটাই তৃণমূল কংগ্রেসের অভিজ্ঞ নেতারাও মনে করছেন। রাজ্যে আরএসএস বেড়েছে গত চারবছরে। গত চার বছরে তাঁদের শাখার সংখ্যা ৫৮০ থেকে হয়েছে ১৪৯০। বৃদ্ধি ১৫৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-র এমন বিকাশ কখনও হয়নি। রাজ্যে আরএসএস ‘অনুপ্রবেশ’ সমস্যাকেই প্রধান বিপদ বলে প্রচার শুরু করেছে। আর খোদ মমতা ব্যানার্জিই সংসদে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুতে সঙ্ঘ পরিবারের বক্তব্য তৃণমূলের সাংসদ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন।

দিনটি ছিল ২০০৫-র ৪ঠা আগস্ট। লোকসভায় অধ্যক্ষের মুখের উপরে কাগজের তাড়া ছুঁড়ে দিয়ে অভব্যতার এক নজির সৃষ্টি করেছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী। পুরো সংসদ বিস্মিত হয়েছিল তাঁর এই কাণ্ডে। কেন সেদিন তিনি এমন করেছিলেন? কারণ, সেদিন তিনি সংসদে ‘অনুপ্রবেশ সমস্যা’ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে অনুপ্রবেশে মদত দিচ্ছে, তার গল্প শোনাতে চেয়েছিলেন। অনুমতি মেলেনি। তাই ওই অভব্যতা। অর্থাৎ, রাজ্যে যখন শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলনের অবস্থানের কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি পা রাখার সামান্য জায়গা পাচ্ছে না, তখন ‘পশ্চিমবঙ্গের অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সংসদে বলে সঙ্ঘ পরিবারের কাছে বার্তা দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি — ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

গত চারবছরে রাজ্যে মৌলবাদীরাও বেড়েছে আরএসএস-র মত। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে এই মৌলবাদীদের সমর্থকরা কখনও মাথা তুলতে পারেনি। মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য এই প্রবল স্বাধীন বাংলাদেশ বিরোধী, ধর্মান্ধ, উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী অংশের একটি সহযোগিতা ছিল। সম্প্রতি সারদার টাকা সেই উগ্রপন্থীদের হাতে পৌঁছোনর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আবার মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসা হাসান আহমেদ ইমরানের নাম জড়িয়েছে। তিনি রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী সিমি-র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ২০০৭-’০৮ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে আশ্রয় নেন। তসলিমা নাসরিনের ভিসার বিষয় নিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে এক উত্তেজনা, ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন ইদ্রিশ আলি। তাকেও মমতা ব্যানার্জি সাংসদ করেছেন। ফলে গত সাড়ে তিন বছরে রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী একাংশ সরকার এবং শাসক দলের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। যা আসলে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যের পক্ষে ঘোর লজ্জার। তবু তাই হয়েছে।

দুই সাম্প্রদায়িক শক্তিই এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে। বেড়েছে সরকারের ব্যর্থতা, আর্থিক মন্দাকে ভিত্তি করে। এমন পরিস্থিতিতে সামনে বিধানসভা নির্বাচন। কাজের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলন অনুঘটক হতে চলেছে সেখানে। ভাতের দাবিতে গর্জে ওঠা লড়াই হয়ে উঠতে চলেছে নিয়ন্ত্রক। আর ঠিক এখনই, মাংসের কাজিয়া, দেশপ্রেমের প্রচার জরুরি মমতা ব্যানার্জিরও। বিজেপি, আরএসএস সেই কাজই করছে।

তাই নীরবতা মুখ্যমন্ত্রীর। কোনও সন্দেহ নেই।

Mamata’s Retrograde Policy

May 23, 2015

382519

Mamata’s ‘No’ in CBI Interrogation of Police Officers

February 24, 2015

375666

Saradha Chief Wanted to Escape to POK

December 17, 2014

পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে পালাতেন সারদাকর্তা: রিপোর্ট

sudipa-sen-kunal-ghosh-655x360

saradha-1
saradha-2

Derailment of Jindal’s Salboni Steel Plant

December 4, 2014

368970

Badshahi Sadak in Bardhaman

October 11, 2014

এন আই এ-র নজরে মঙ্গলকোট থেকে কীর্ণাহার, অনুব্রত থেকে মেহবুবের দাপটের এলাকা

সপ্তমী পুজোর দিন (২রা অক্টোবর) বর্ধমান শহর, স্টেশনের খুব কাছে, খাগড়াগড়ে এক বিস্ফোরণে ২জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত আর একজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় বর্ধমান হাসপাতালে ভর্তি। একটি বাড়ির দোতলায় বিস্ফোরণ হয়। বাড়িটি এক তৃণমূল কর্মীর। বাড়ির একতলায়, গ্যারেজে তৃণমূলের অফিস আছে। ঘটনাস্থলে গ্রেনেডসহ প্রচুর বিস্ফোরক, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটসহ প্রচুর রাসায়নিক এবং সন্ত্রাসবাদের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। শুধু সি আই ডি নয়, ঘটনার মাত্রা বুঝে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এন আই এ)-র একটি দলও এলাকায় ইতোমধ্যেই প্রাথমিক তদন্ত করেছে। সরেজমিন তদন্ত করে এই বিশেষ প্রতিবেদনটি লিখেছেন চন্দন দাস। গ্রাফিক্স- প্রদীপ রায়।

santrasee-map-badshahi-road

বাদশাহী সড়ক ধরে মমতা-রাজে উগ্রপন্থীদের করিডর

মঙ্গলকোট, ১০ই অক্টোবর, ২০১৪:  রাস্তার নাম বাদশাহী রোড। শের শাহের আমলে তৈরি এই রাস্তার ধারে বড় বড় জলাশয় এবং বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্য নজরে পড়বেই। জলাশয়গুলি মূলত সেনাবাহিনীর ঘোড়াদের জন্য বানানো হয়েছিল। এই রাস্তা ধরে বর্ধমান থেকে সরাসরি মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, কীর্ণাহার, নানুর হয়ে পৌঁছানো যায় সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবাদে। গোয়েন্দাদের পাওয়া একাধিক তথ্য জুড়লে বোঝা যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত ধর্মনিরপেক্ষ শাসক শের শাহের বানানো এই পথ ধরেই বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে বর্ধমান পর্যন্ত নিজেদের জাল বিছিয়েছে মৌলবাদী উগ্রপন্থীরা। এখনও পর্যন্ত, খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণের পরে উগ্রপন্থীদের যে’কটি ডেরার হদিশ মিলেছে, তার সবকটিই এই ঐতিহাসিক, গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার আশপাশে। আর এই বাদশাহী পথের ধারে থাকা জনপদগুলির বর্তমান নিয়ন্ত্রকরা নানাভাবে উগ্রপন্থীদের সাহায্য করেছেন এবং সাহায্য নিয়েছেন।

জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এন আই এ) শুক্রবার থেকে তদন্ত শুরু করেছে। বর্ধমানে তারা শনিবারই তদন্ত শুরু করতে পারে। আর, ভবানী ভবন থেকে বর্ধমান জেলা পুলিসের কাছে যে বার্তা পৌঁছেছে, তাতে জানা যাচ্ছে শুধু খাগড়াগড় নয়, এন আই এ-র নজরে রয়েছে মঙ্গলকোট-কেতুগ্রাম-নানুর-কীর্ণাহারের করিডোরও। এদিনই মঙ্গলকোটের ভাটপাড়ায় একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। খবর পেয়েই জেলা পুলিস ছুটেছে। এন আই এ পৌঁছানোর আগে রাজ্য পুলিসের এই তৎপরতা কেন? এ প্রশ্নও উঠেছে।

মঙ্গলকোট এই উগ্রপন্থা কাজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। আপাতত তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর প্রবল দ্বন্দ্ব সত্বেও মঙ্গলকোট ব্লকের নিয়ন্ত্রক এখন বোলপুরের সেই অনুব্রত ওরফে কেষ্ট মণ্ডল। ব্লকের সদর মঙ্গলকোট পঞ্চায়েত এলাকায়। এখানেই থানা এবং পঞ্চায়েত সমিতির অফিস। এবং গত ২০১১ থেকে মঙ্গলকোট পঞ্চায়েত এলাকাটিতে তৃণমূল ছাড়া আর কোনও দলের পতাকা তোলা, টাঙানো নিষিদ্ধ। অনেক বামপন্থী কর্মী ঘরছাড়া। এমনকি কেষ্ট মণ্ডলের বিরোধী গোষ্ঠীর হওয়ার কারণে আজাদ নামে এক তৃণমূল দুর্বৃত্ত এলাকাছাড়া হয়েছিল। থাকছিল নানুরে। সম্প্রতি বোলপুরে তৃণমূল অফিসের সামনে থেকে সে অপহৃত হয়। পরে তার লাশ উদ্ধার হয়। গোয়েন্দাদের অনুমান, মঙ্গলকোট-কেতুগ্রাম-নানুর-কীর্ণাহার জুড়ে চলতে থাকা বিশেষ কোনও তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল দীর্ঘদিন অনুব্রত মণ্ডলের লোকজনের অত্যাচারে টিকতে না পারা আজাদ। কী সেই তথ্য? আজাদ খুন হয়ে গেলেও, এন আই এ নানুর-কেতুগ্রাম-মঙ্গলকোটে ঠিকমতো তদন্ত করতে পারলে, সেই রহস্য ভেদ করতে পারবে বলেই রাজ্যের গোয়েন্দাদের একাংশের আশা। রাজ্য পুলিসের এই অংশটি মূলতঃ তৃণমূল নেতাদের মাতব্বরি, জুলুমে বীতশ্রদ্ধ। কিন্তু ‘চাকরি রক্ষার’ তাগিদে নীরব।

এই গোয়েন্দাদের মতে বাদশাহী রোডের বৈশিষ্ট্য এবং গত কিছুদিন ধরে এই রাস্তার কাছাকাছির গ্রামগুলিতে ঘটে চলা ঘটনা বিশ্লেষণ ছাড়া খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডের প্রকৃত সত্য, উগ্রপন্থীদের তৎপরতার মাত্রা জানা যাবে না। বর্ধমানে বাদশাহী রোডের কাছেই উগ্রপন্থীদের তিনটি ডেরার হদিশ মিলেছে। খাগড়াগড়ে যেখানে বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেখান থেকে বাদশাহী রোডের দূরত্ব বড়জোর দশ মিনিটের। বর্ধমান শহরের এই এলাকাটিতে তৃণমূল ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের কাজকর্ম করতে দেয় না পুলিস, শাসকদল। এই এলাকাটির দখল রয়েছে মূলতঃ মেহবুব, সেলিম, বাদশা-র হাতে। সেলিম স্থানীয় কাউন্সিলর।

এর পরের এলাকা বর্ধমান সদর। বর্ধমান সদরের দেওয়ানদীঘি। বিধানসভা নির্বাচনের পরেই রাস্তার উপরে এখানে তৃণমূলীরা খুন করেছিল দুই পার্টিনেতা প্রদীপ তা’ এবং কমল গায়েনকে। তারপর থেকে আশঙ্কাই সঙ্গী এলাকাটির। উল্লেখ্য, ওই দুই নেতা দীর্ঘদিন খাগড়াগড়, মাঠপাড়া এলাকায় পার্টির প্রতিদিনকার কাজের উদ্যোগ, বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আপাতভাবে তাঁদের খুনের সঙ্গে তৃণমূলের এলাকা দখল ছাড়া আর কিছুর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণ মেলে না। কিন্তু ওই বাদশাহী রোডের ধারে ওই এলাকা থেকে সি পি আই(এম)-কে পিছু হটাতে না পারলে অস্ত্র চালান কিংবা বিস্ফোরক বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে কিছুটা অসুবিধা হওয়ার সুযোগ থাকে! এটাও একটা কারণ হতে পারে ওই দুই নেতা খুনের।

বর্ধমান সদর পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর নরজা মোড়। এখান থেকেই মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, নানুর-কীর্ণাহার হয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে এগিয়ে গেছে বাদশাহী রোড। মঙ্গলকোট এখন মমতা ব্যানার্জির প্রিয় অনুব্রত মণ্ডলের দখলে। মঙ্গলকোটের কাছেই শিমুলিয়া। সেখানে গ্রামের ভিতরে ধান খেতের মধ্যে এক রহস্যময় ‘মাদ্রাসা’ গড়ে তুলেছিলেন তৃণমূল কর্মী বোরহান শেখ। সেখানে মাদ্রাসার কোনও পোস্টার, প্ল্যাকার্ড নেই। গ্রামের কোণায়, কিছুটা আড়ালে মাটির ঘর। ঘরগুলি তোলা হয়েছে ধান খেতের আল ছুঁয়ে। চারিদিকটি ঘেরা। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না যে, এখানে কেউ থাকে কিংবা পড়াশোনা হয়। গ্রামবাসী ইউনিস শেখ জানালেন, ৪০-৪৫টি বাইরের ছোট মেয়ে এখানে থাকতো। ৫জন পুরুষ এবং ২জন মহিলা শিক্ষক ছিলেন। মাঝেমাঝে বাইরে থেকে চার পাঁচজন শিক্ষক আসতেন। মাদ্রাসার জমিটি দিয়েছিলেন বোরহান শেখই। তার স্ত্রীও মাদ্রাসায় পড়াতেন। তবে ছেলেদের মাদ্রাসার ধারেকাছে ঢুকতে দেওয়া হত না। ২রা অক্টোবর খাগড়াগড়ের ঘটনার পরই সবাই উধাও হয়ে গেছে। পুলিস যদিও এসেছিল ৬ তারিখ।’’ প্রসঙ্গতঃ শিমুলিয়ার এই অদ্ভুত মাদ্রাসা চালানো বোরহান শেখের কাকা ডালিম শেখ ওই এলাকার তৃণমূলের সর্বেসর্বা। আর পঞ্চায়েতটি বলা বাহুল্য, তৃণমূলই জোর করে, ভোট লুট করে জিতেছে গত নির্বাচনে।

উল্লেখ্য, মঙ্গলকোটের কুলসোনায় পুলিস উগ্রপন্থীদের তৎপরতার সূত্র পেয়েছে। জামাতপন্থীদের যাতায়াত ছিল সেখানে। সেই কুলসোনা আবার ভাল্যগ্রামে। এই ভাল্যগ্রামেই খুন হয়েছিলেন সি পি আই (এম)-র নেতা ফাল্গুনি মুখার্জি। ২০০৯-র ওই ঘটনার পর থেকেই তৃণমূলীদের আতঙ্ক বিস্তার শুরু হয় মঙ্গলকোটে। সেই সুযোগে কুলসোনায় পৌঁছেছে উগ্রপন্থীরা।

মঙ্গলকোট পেরিয়েই অজয়ের উপর সেতু। ওপারে কেতুগ্রাম। কেতুগ্রামের যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক শাহনাওয়াজ খান। তিনি তৃণমূলের বিধায়ক। তার ভাই কাজল শেখের কর্তৃত্ব কায়েম রয়েছে নানুর, কীর্ণাহারে। কেতুগ্রাম হলো সেই জায়গা, যেখানে ২০০৯ থেকে ১৪জন সি পি আই (এম) কর্মী শহীদ হয়েছেন।

সি পি আই (এম) নেতা অচিন্ত্য মল্লিকের কথায়,‘‘বাদশাহী রোড তো তখনও ছিল। যখন বামফ্রন্ট সরকারে ছিল, এই সব এলাকায় সব রাজনৈতিক দলের নিজেদের কথা বলার সুযোগ, অধিকার ছিল। আমাদের আন্দোলন, কর্মসূচীর কারণে আমরাই মানুষের কাছে বেশি গ্রহণীয় ছিলাম। আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল, খুন করা হয়েছিল আমাদের দুর্বল করতে। লাভ হয়েছে কাদের, কারা ঘাঁটি করার সুযোগ পেয়েছে, এখন সবাই দেখছেন। সন্ত্রাস, একাধিপত্যের সুযোগ নিয়েছে উগ্রপন্থীরা।’’

কেতুগ্রাম লাগোয়া নানুর। বীরভূম আর বর্ধমান এখানে মিশেছে।

কীর্ণাহার নানুরে। রাষ্ট্রপতি কীর্ণাহারের বাড়িতে উপস্থিত থাকাকালীনই উগ্রপন্থীরা কাজ করেছে, তার প্রমাণ তো ইতোমধ্যেই মিলেছে। কিন্তু কাজল শেখ-শেখ শাহনাওয়াজের খাস তালুক নানুর-কীর্ণাহারে কী করে নিজেদের ডেরা বানালো উগ্রপন্থীরা? নানুর পেরিয়েই ঢুকে পড়া যায় মুর্শিদাবাদে। বড়ঞা হয়ে বেলডাঙ্গা যাতায়াত করেছে দুষ্কৃতীরা এই তথ্যও পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তবে গোয়েন্দাদের একাংশ মনে করছেন বাদশাহী রোডের ধারে আরও কিছু ডেরা ছিল। যার হদিশ এখনও মেলেনি।

প্রাথমিকভাবে সি আই ডি-ও মনে করছে খাগড়াগড়, নবাববাগ, মাঠপাড়া, শিমুলিয়া, কুলসোনা, কেতুগ্রাম, কীর্ণাহার, বেলডাঙ্গা — প্রতিটি এলাকাতেই একেকটি ‘শেলটার’ তৈরি করেছিল উগ্রপন্থীরা। শিমুলিয়ায় যেমন চলতো প্রশিক্ষণ। সেখানে মিলেছে কম্পিউটার, বড় বড় ব্যাটারি, বিভিন্ন সিডি।

Saradha-Queen Mamata Has To Answer

September 11, 2014

চিট ফান্ড কাণ্ডে গরিব মানুষের টাকা
লুট করলে কেন — সারদারানী জবাব দাও

সুজন চক্রবর্তী

২০১৩ এর এপ্রিল মাস। বাংলার নববর্ষের সময়। গোটা রাজ্যের গ্রাম-শহর এলাকার অজস্র মানুষ টের পেলেন যে তাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। বুঝতে পারলেন যে তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা লুট হয়ে গেছে। লুট করেছে সারদা চিট ফান্ড সহ ছোট-বড় চিট ফান্ড কোম্পানিগুলি। অজস্র আমানতকারীর সেই কান্না আর হাহাকার আছড়ে পড়ল কলকাতায় বাইপাসের ধারে তৃণমূল কংগ্রেসের সদর দপ্তরে। আছড়ে পড়ল কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে। কাতর আবেদন— ‘দিদি, আমাদের বাঁচান’। দিদির প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা চিট ফান্ডওয়ালারা। দিদির ভাইয়েরা তার অংশীদার। চিট ফান্ডের টিভি চ্যানেলে অহর্নিশি দিদিরই প্রচার, দিদিরই ভজনা। দিদিই সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী। অতএব দিদিরই কর্তব্য লুটের টাকা ফেরত দেবার ব্যবস্থা করা আর অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া। দিদি বললেন— ‘যা গেছে, তা গেছে’। ধামাচাপা দেওয়া ছাড়া কোন ব্যবস্থাই বাস্তবতঃ হলো না।

sarada-combiled3

বিপর্যস্ত গরিব মানুষ থানা-পুলিসে অভিযোগ জানাতে গেলে, অভিযোগ নেওয়া দূরের কথা— পারলে অভিযোগকারীকে‍‌ই হুমকি শুনতে হয়েছে। আক্রান্ত হতে হয়েছে। গ্রাম শহরের গরিব মানুষগুলো, অন্তত ৭৮জন, আত্মহত্যার চরম পথ বেছে নিলেন। বহু মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে ঘটি বাটি বিক্রি করলেন, কেউবা বাড়ি ছেড়ে দেশান্তরী। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে অসংখ্য, অজস্র মানুষকে। সরকার নির্বিকার। বিপর্যস্ত এই মানুষের পাশে নয়, বরং সরকার লুটেরাদের পাশে— লুটেরাদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত। চিট ফান্ড কোম্পানিগুলোর সম্পত্তি খুঁজে বাজেয়াপ্ত করাও হলো না, মালিকেরাও গ্রেপ্তার হলো না। তারা বহাল তবিয়তে ঘুরছেন। তাদের মাথার উপর শাসকদলের ছাতা। রাজ্য সরকার কর্তৃক গঠিত Special Investigation Team বরং ধামাচাপা দেবার কা‍‌জে ব্যস্ত। বাস্তবে Suppression of Ivestigation Team।রাজ্য সরকারের সমস্ত বাধা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট ঘটনার গভীরতা বিবেচনায় সি বি আই কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সুবিধাভোগী কারা এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্র কি— তা খুঁজে বার করতে হবে। বিভিন্ন সরকারী সংস্থা তাদের সাহায্য করবে। এখনও পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে তা হিম‍‌শৈলের চূড়া মাত্র। লুটেরাদের জাল আরও অনেক গভীরে।

লুটের মূল ভাগীদার তৃণমূল নেতৃত্ব

তদন্তের স্বার্থে এখনও পর্যন্ত যাদের ডাকা হয়েছে তারা প্রায় সবাই তৃণমূলের হয় নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ— না হয় তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ। এর বাইরে দু-একজন ব্যবসায়ী বা অন্য কেউ আছেন। কি জানা গেছে এখনও পর্যন্ত? দেখা যাচ্ছে গরিব মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় লুট করেছে চিট ফান্ডওয়ালারা। লুটেরাদের উপর বাটপারি করেছে তৃণমূলের নেতারা। কে নেই এই তালিকায়? সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী তৃণমূল সাংসদ কুণাল ঘোষের মাস মাইনে ১৬ লক্ষ টাকা। সাংসদ অর্পিতা ঘোষ দেড় লক্ষ টাকা। তৃণমূল নেতা রজত মজুমদার ১০ লক্ষ টাকা। সাংসদ শতাব্দী রায় ২ লক্ষ টাকা। এইরকম সব বহর। টাকা যেন খোলামকুচি! তৃণমূলের মন্ত্রী শ্যামাপদ মুখার্জির লোকসানে চলা সিমেন্ট কারখানা বেশি দামে কিনতে হবে সারদা কোম্পানিকে। শুভাপ্রসন্নর জন্ম-না-নেওয়া চ্যানেল কিনতে হবে কয়েক কোটি টাকায়। সাংসদ আহমেদ হাসান ইমরানের কাগজ কিনতে হবে পনের কোটি টাকায়। এরকম বিশাল লম্বা তালিকা। স্রেফ তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ, চিট ফান্ডের লুট— সব মিলিয়ে তৃণমূলের ‍ছোট-বড় নেতাদের সম্পত্তি বিগত তিন বছরে কতগুণ বেড়েছে তার কোন হিসাব নেই। দু-চারশো কোটি টাকাও যেন হাতের ময়লা এদের কাছে। মূল ভাগীদার তৃণমূল নেতৃত্ব— সন্দেহ নেই। চিট ফান্ড কাণ্ডে প্রতারকরাও বোধ হয় জানতেন না, যে তাদের চাইতেও বড় প্রতারকরা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে আসীন। প্রতারকদেরও প্রতারণা করার যোগ্যতাসম্পন্ন তৃণমূলের এই বড় নেতারা, সুপ্রিমো থেকে শুরু করে সবাই— এটা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ধরা এরা পড়বেই।

মুখ্যমন্ত্রী কি কিছুই জানতেন না ?

সাধারণ মানুষ তো বটেই, তৃণমূলের কোন নেতা-কর্মীও কি তা বিশ্বাস করেন? তৃণমূলের বাগানে মুখ্যমন্ত্রীর অজান্তে একটা ঘাসও জন্মাতে পারে না, একটা আগাছাও পরিষ্কার করা যায় না। সবই তিনি। একমেবাদ্বিতীয়াম্‌। একনায়িকা সুপ্রিমো। অথচ তিনি বলছেন— তিনি এদের চিনতেনও না, জানতেনও না। সম্পূর্ণ অসত্য। মিথ্যাচার। সারদা কোম্পানির সাথে রেলদপ্তরের আই আর সি টি সি-র ‘ভারততীর্থ’ চুক্তি হয় ২০১০ সালে। মুখ্যমন্ত্রীই তখন রেলমন্ত্রী। মমতা-বন্দনার লক্ষ্য নিয়ে সারদার মিডিয়া কোম্পানির গ্রুপ তৈরি হয় ২০১০ সালে। জঙ্গলমহলের জন্য সারদা কোম্পানি যখন অ্যাম্বুলেন্সগুলি দেয়, মুখ্যমন্ত্রী তার উদ্বোধক। সারদা কোম্পানি যখন কলকাতা পুলিসকে মোটরবাইক দেয়, তিনিই তখন পুলিস মন্ত্রী। এরকম কত কিছু। সূর্যকান্ত মিশ্ররা ২০১২ সালে যখন বিধানসভায় চিট ফান্ড বিষয়ে আলোচনা চান এবং বিধায়করা আক্রান্ত হন— তখনও তিনি জানতেন না? গৌতম দেব যখন কালিম্পঙের ডেলো বাংলোয় চিট ফান্ড মালিকদের সা‍‌থে তার গোপন বৈঠকের কথা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন— তখনও কি তিনি মনে করতে পারেননি— কি উদ্দেশ্যে মধ্যরাত্রের সেই গোপন বৈঠক? অথচ ২০১৩ সালে ১লা বৈশাখের আগে তিনি নাকি কিছুই জানতেন না। এমনটাই বলছেন। সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যাচার। এটা তাঁর মজ্জাগত গুণ কিনা— তিনিই বলতে পারবেন। কিন্তু সত্য কথা বলার বদ-অভ্যাস যে তাঁর নেই, বরং মিথ্যায় তিনি অনেক সাবলীল — এটাই রাজ্যবাসীর কাছে ক্রমশঃ স্পষ্ট হচ্ছে।

কলঙ্কিত মুখ্যমন্ত্রী — রাজ্যের লজ্জা

২০০৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের অগ্রগতি শুরু হলো। ২০০৮ সালে জুলাই মাসে সারদা চিট ফান্ডের জন্ম। এরপর সময় যত এগিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থন যত বেড়েছে, আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন চিট ফান্ড তৈরি হয়েছে কয়েকগুণ গতিতে। চিট ফান্ডের লুটের পয়সায় তৃণমূল তত পুষ্ট হয়েছে। চিট ফান্ডের পয়সায় মমতা-বন্দনার জন্য চ্যানেল এবং খবরের কাগজ তৈরি হয়েছে। খেলার মাঠ, পুজোর প্যান্ডেল, বাংলা চলচ্চিত্র— একে একে অনেকেই কলুষিত হয়েছে চিট ফান্ড আর তৃণমূল কংগ্রেসের লুঠের যুগলবন্দীতে। এমনকি কলুষিত হয়েছে ঐতিহ্যের ভারতীয় রেলও। মুখ্যমন্ত্রীই দলের সুপ্রিমো, তিনি এ দায় অস্বীকার করবেন কি করে? তিনিই তো সর্বেসর্বা।

অতীতে ভারতবর্ষের দু-একটা রাজ্যে হলেও পশ্চিমবাংলার সমাজজীবন— রাজনীতি কখনো এভাবে কলুষিত হয়নি। স্বাধীনতার পর রাজ্যে অনেকেই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। প্রফুল্ল ঘোষ, বিধানচন্দ্র রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পর্যন্ত অনেকেই। এ ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি কখনো কাউকে স্পর্শ করতে পা‍রেনি। এই প্রথম। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত জনেরাও তাঁর দিকে আঙুল তুলেছেন। এই প্রথম রাজ্যের কোন মুখ্যমন্ত্রী জনসমক্ষে এভা‍‌বে কলঙ্কিত হলেন। এটা লজ্জা। রাজ্যবাসীর লজ্জা। ছিঃ।

সততার প্রতীক ?

মুখ্যমন্ত্রী আগে তার নামের আগে ডক্টরেট লিখতেন। ভুয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়ো ডিগ্রি। তাই এখন আর লিখতে সাহস পান না। অসততা। চূড়ান্ত অসততা। না বুঝে তো নয়, জেনে বুঝেই এই অসততা তিনি করতেন।

গ্রাম শহর সর্বত্র মুখ্যমন্ত্রীর লম্বা লম্বা কাট-আউটের তলায় বড় বড় করে শব্দবন্ধ লেখা থাকত ‘সততার প্রতীক’। এতই হাস্যকর এবং অসততা এটা— যে এখন আর তা লেখার সাহস কেউ দেখান না। বরং লম্বা কাট-আউটের তলায় বেশ মানানসই শব্দবন্ধ হতে পারে ‘সারদার প্রতীক’।

কোন সন্দেহ নেই যে এ রাজ্যের তৃণমূল সমর্থক সহ সাধারণ মানুষ অনেকেই মমতা ব্যানার্জির প্রতি যথেষ্ট দুর্বল ছিলেন। অনেকটাই বিশ্বাস করতেন। প্রচারের দৌলতে সৎ, পরিশ্রমী একজন নেত্রী বলে মনে করতেন। তৃণমূল প্রচারও করত সেভাবেই। যেন প্রতিটি কেন্দ্রেই প্রার্থী মমতা ব্যানার্জি। মানুষের এই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু এখন?

রাজ্যের বামপন্থীরা প্রথম থেকেই বলছি। চিট ফান্ডের লুট আর তৃণমূলের নেতা নেত্রীরা যেন সমার্থক। এ রাজ্যের রাজনৈতিক মহল বিগত কিছুদিন ধরেই একই কথা বলছে। কিন্তু এখন তো সর্বসমক্ষেই প্রশ্ন উঠে গেছে। চিট ফান্ডের লুটের টাকার একটা বড় অংশ গিয়েছে তৃণমূল নেতাদের পকেটে। গত তিন বছরে তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের সম্পত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে সর্বত্র। তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা চিট ফান্ড কাণ্ডে একে একে ধরা পড়ছেন। তালিকায় আরও বহু। রেহাই পাবে না। ধরা পড়ল বলে। দলের প্রায় প্রত্যেকটি মুখই অসততার প্রতীক। চিট ফান্ডের প্রতীক। মুখ্যমন্ত্রী মুখ খুলছেন না কেন? প্রতারিত গরিব মানুষগুলো বিপদে, আর চিট ফান্ডের মালিকরা বহাল তবিয়তে ঘুরছে। গত দেড় বছরে রাজ্য সরকার ব্যবস্থা নেয়নি কেন? প্রতারিত মানুষেরা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না কেন? মুখ্যমন্ত্রী মুখ খুলুন। সারদা সহ চিট ফান্ডের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তৃণমূল কংগ্রেসের বড় নেতা, এম পি— সবই তো সুপ্রিমোর ইচ্ছায়। কেন? তৃণমূল কি সত্যিই চিট ফান্ডের দল হয়ে গেল? মুখ্যমন্ত্রী মুখ খুলছেন না কেন? মানুষ কি করে আপনাকে বিশ্বাস করবে? বরং গ্রাম গঞ্জের অজস্র মানুষ— যাঁরা আপনাকে বিশ্বাস করতেন, তাঁদের বিশ্বাসভঙ্গ হচ্ছে প্রতিদিন।

চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন — পালিয়ে যাবেন না

তৃণমূল কংগ্রেসেরই নেতারা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছেন একে একে। তৃণমূলের সাংসদ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন— ডেলোর বাংলোয় মধ্যরাত্রের সভায় যারা ছিল— তাদের নিয়ে সি বি আই-এর তদন্তে বসুন মুখ্যমন্ত্রী। কি গোপন শলাপরামর্শ হয়েছিল সেখানে? সততা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে যখন, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। পালিয়ে যাবেন না। আপনাকে পালিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। রাজ্যের সর্বসান্ত মানুষ— টাকা ফেরত চায়। কার পকেটে টাকা— আপনিই সবটা জানেন। আপনিই তৃণমূলের সুপ্রিমো। সে টাকা উদ্ধার করুন। দোষী চিট ফান্ড মালিক আর তৃণমূল নেতাদের যোগ্য শাস্তি দিন। সিট এর যে অফিসারেরা ধামাচাপা দিয়েছে তাদের গ্রেপ্তার করুন, শাস্তি দিন।

নচেৎ অাপনার রাজ্য শাসনের নৈতিক অধিকার থাকতে পারে না

জনসমক্ষে এটা ক্রমশঃই স্পষ্ট হচ্ছে যে, চিট ফান্ড কাণ্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী মুখ্যমন্ত্রী। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে। অংশীদার আপনার মূল সহকর্মীরা। তৃণমূল কর্মীরাও আড়ালে আবডালে তাই বলছেন। আপনার দলের সাংসদও সেই কথাই বলছে।

চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। তদন্তের মুখোমুখি হোন। নিজেকে পরিষ্কার করার সুযোগ নিন। কলঙ্কের যে কালি আপনার এবং আপনার দলের সারা গায়ে— তা পরিষ্কার করার সুযোগ নিন। অভিযোগগুলোকে মিথ্যা প্রমাণ করার ব্যবস্থা করুন। চিট ফান্ডের কলঙ্কিত মুখ্যমন্ত্রী— রাজ্যবাসী চায় না। এটা রাজ্যের লজ্জা। হয় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন, নচেৎ পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারকে কলঙ্কিত করার কোন নৈতিক অধিকার আপনার থাকতে পারে না। চেয়ার ছেড়ে দিন।

গ্রাম-শহরের ঘামঝরানো, গরিব-গুরবো লক্ষ লক্ষ প্রতারিত মানুষের কান্না আর চোখের জলের স্রোত পশ্চিমবাংলাকে কলঙ্কমুক্ত করবেই— এটাই হবে রাজ্যবাসীর শপথ।

Mamata’s Trepidation

August 30, 2014

361823

“Petty Matters…”

July 21, 2014

358478