Posts Tagged ‘paratha’

Biriyani Checkmates Noodles & Rolls

May 15, 2016

চাউমিন, রোলকে টেক্কা বিরিয়ানির

তাপস গঙ্গোপাধ্যায়

 biriyani1

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশ‌কের মাঝামাঝি, বর্ষার বিকেলে রবীন্দ্র সরোবরের মাঠে ফুটবলের নামে কাদাজল ঘেঁটে সন্ধ্যার মুখে বাড়ি ফেরার সময় যেদিন তারকদা আমাদের নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ঢুকতে বলে ঢাকাই পরোটার অর্ডার দিতেন, সেদিন মনে হত এর চেয়ে বেশি সুখ একটা স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছেলে আর কি চাইতে পারে বা পেতে পারে।কলেজ পেরিয়ে যখন ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছি রেগুলার সেই ষাটের দশকের গোড়ায় সুযোগ পেলেই, এবং পকেটে রেস্ত থাকলে চলে যেতাম ‌এসপ্ল্যানেডে একটি দেবভোগ্য খাদ্য আস্বাদের আকাঙ্খায়। দু’‌আনায় এক বাটি ছোলার ডালের সঙ্গে মুচমুচে করে ভাজা অনেকটা দশ–‌বারো পরতের ফুলকো লুচির মতো দেখতে ঢাকাই পরোটা নয়, দেবভোগ্য খাদ্যটির ঠিকানা ছিল সুরেন ব্যানার্জি রোডের অনাদি কেবিন। ছ’‌আনায় প্লেট ওপচানো মোগলাই পরোটায় জিভের আরাম, মনের বিরাম দুই–‌ই মিলত। কিন্তু ডিমের কুসুমে চোবানো পরোটাকে কেন মোগলাই বলা হত তা আজও পরিষ্কার নয়।

সত্তর দশকে অনাদি কেবিনের জায়গা দখল করল নিজাম। মোগলাই পরোটার জায়গায় দুটি পুরুষ্টু ডালডায় সাঁতরে ওঠা পরোটার সঙ্গে এক প্লেট কাবাব, সঙ্গে আর এক প্লেট পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা ও লেবু। হুরি পরিদের সঙ্গে বেহস্তেই শুধু ওই অনবদ্য ভোজ্য সুলভ তা জেনে গেছি ততদিনে। সুলভ বলছি বটে তবে পাঁচ সিকি মানে এক টাকা চার আনা সত্তর দশকের গোড়ায় নেহাত সস্তা নয়।

কিন্তু সত্তর দশকের শেষে পরোটা কাবাবের আলাদা অস্তিত্ব ঘুচে গেল যখন পাড়ায় পাড়ায়, মোড়ে মোড়ে, অলিতে গলিতে চাকা লাগানো কাঠের চলমান ভোজশালায় পরোটার ভেতরেই পাটিসাপটার ক্ষীরের বদলে কাবাবের তিন চার পিস টুকরো পেঁয়াজ লেবুর রস দিয়ে খবরের কাগজের আধফালি দিয়ে মুড়ে হাতে তুলে দিয়ে দোকানি এক গাল হেসে বলতেন, খেয়ে দেখুন— চিকেন রোল। একটাতেই পেট ভরে যাবে। তখন দাম ছিল দেড় টাকা। পরে বাড়তে বাড়তে সেই রোলই আজ বিকোচ্ছে তিরিশে, সঙ্গে এগ থাকলে চল্লিশে।

স্থায়ী দোকানে এগ–‌চিকেন খানদানের সুবাদে যখন পঞ্চাশ ছাড়াল, যখন কলকাতা ছাড়িয়ে মফস্‌সলের সব শহরে, গঞ্জে, সিনেমা হলের পাশে, বাজারে, স্কুল–‌কলেজের দরজায় দরজায় রোলের বাজার তুঙ্গে, ঠিক তখনই গত শতাব্দীর নব্বই দশকের মাঝামাঝি রাইটার্সের পেছনে লায়ন্স রেঞ্জে, ক্যামাক স্ট্রিটের ফুটপাথে লাল শালুতে মোড়া পেল্লায় সব পেতলের হাঁড়ি নিয়ে হাজির হলেন নতুন শতাব্দীর আগমনী বার্তা দিয়ে ইস্তানবুল, খোরাসান, সমরখন্দ, তেহরান, দামাস্কাসের ইতিহাস প্রসিদ্ধ রাঁধুনিদের বাঙালি ভাই–‌বেরাদাররা। তেমুজিন, যাকে ইতিহাস চেনে চেঙ্গিস খাঁ নামে, তিনি ভালবাসতেন চাল ও একটুকরো ঘোড়ার মাংসের ওই অসামান্য শিল্প, যা আজ আমাদের কাছে পরিচিত বিরিয়ানি নামে।

আর গত বিশ বছরে বিরিয়ানি কালচার গোটা রাজ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে রোলের দোকান আগে বাড়ির বাইরে পা বাড়ালেই হাতের কাছে মিলত, তা এখন কলকাতায় খুঁজতে হয়। রোলের দোকান আছে, সেই সঙ্গে আছে বাঙালি চাউমিনের খানাও, কিন্তু ৮০, ৯০–‌এর দশকে দুটি বস্তু যেন কুটির শিল্পে পরিণত হয়েছিল সেই সহজ লভ্যতা আর নেই। বাঙালি তুর্কি রোল চীনে নুডলসের ঘ্যাঁট ছেড়ে এখন ঝুঁকেছে চেঙ্গিস, তৈমুর লং–‌এর প্রিয়খাদ্য বিরিয়ানিতে।

বিশ বছর আগে এক বন্ধুর মুখে শুনলাম, রয়্যাল, আমিনিয়া, বিহার, নিজাম, জিশান, আর্সেলানের বিরিয়ানি তো ঢের খেয়েছ, কিন্তু ‘‌দাদা–‌বৌদি’‌র বিরিয়ানি কখনও চেখে দেখেছ?‌ মাদ্রাজি কায়দায় দু’‌দিকে ঘাড় নাড়িয়ে কবুল করলাম — না। তাহলে সোজা চলে যাও। ব্যারাকপুর রেল স্টেশনে। স্টেশন বাড়ির উল্টোদিকেই পাশাপাশি দুটি ঘর। আগে যখন দাদা ও বৌদির সম্পর্ক মধুর ছিল তখন ওই দুটি ঘর জুড়েই ছিল দাদা–‌বৌদির বিরিয়ানির একটাই দোকান। পরে ছাড়াছাড়ির পর একটা শুধু দাদার আর অন্যটা বৌদির হলেও নামে সেই সাবেকি আভিজাত্য— দাদা–‌বৌদির। বলব কি এক দুপুরে ওই বিরিয়ানিতে নাক গুঁজে প্লেট সাবড়ে যখন টালিগঞ্জের বাসায় ফিরে এলাম তখনও মনে হচ্ছে এই অমৃতের স্বাদ তো তাবৎ বাঙালির প্রাপ্য। অথচ প্রচার নেই।

আর গত বিশ বছরে সেই অলৌকিক ঘটনাই লৌকিক হয়ে গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে গেছে। পাঞ্জাব–‌হরিয়ানা–‌পশ্চিম ইউ পি–‌তে কৃষি বিপ্লব হয়েছিল ষাটের দশকের শেষাশেষি, পশ্চিমবঙ্গে বিরিয়ানি বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়েছে গত বিশ বছরে। একটা এগ–‌চিকেন রোলের দামেই এক প্লেট বিরিয়ানি এখন সর্বত্র লভ্য। নব্বই দশকের শেষ, নতুন শতকের শুরুতে এক জোড়া মুরগির ডিম পাওয়া যেত দু’‌টাকায়, হাঁসের ডিমের জোড়া ঘোরাফেরা করত আড়াই টাকায়। আজ এক জোড়া মুরগির ডিম ১০–‌এর নিচে কলকাতার বাজারে মিলবে না। হাঁসের ডিম একটার দাম সাত থেকে আট। তাহলে কেন রোলের দোকান, যা এক সময় গোটা রাজ্য ছেয়ে ফেলেছিল, আজ কেন এত কম, তার উত্তর রয়েছে ডিমের দামে।

একই কারণে নুডলসের দামও গত বিশ বছরে এতই বেড়েছে যে বাঙালির চীনে–‌শেফ হওয়ার সাধ বলতে গেলে ঘুচে গিয়েছে। আর যদি হিসেব কষি তাহলে বলব পঞ্চাশের দশকের দু’‌আনার ঢাকাই পরোটা, ষাটের দশকের ছ’‌আনার মোগলাই পরোটা বা সত্তর দশকের পাঁচসিকির সেই পরোটা ও কাবাবের খরচেই আজ থালা ভর্তি রঙিন ভাতের সঙ্গে বড় এক পিস মুরগি বা পাঁঠার মাংস, একটি কুক্কুটান্ড এবং একটি চন্দ্রমুখীর চাঁদপানা আধখানা দামে, মানে ও ভারে একই। ঢাকাই, মোগলাই বা কাবাবের সঙ্গে পরোটা সবই ছিল আটা বা ময়দার বড় সাইজের তক্তি।

বাঙালির (‌এর মধ্যে হিন্দু বা ‘‌মুসলমান’‌ বলে কোনও ভেদ নেই)‌ রসনা, মনন ও উদর যেভাবে অন্নে তৃপ্ত হয় ময়দা বা আটায় তার ভগ্নাংশও হয় না। এ আমার কোনও মনগড়া দাবি নয়। পঞ্চাশ–‌ষাটের দশকে প্রফুল্ল সেন তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব জামিন রেখে এই সত্যের সন্ধান পান। একই সত্যের মুখোমুখি হন আর এক খাদ্যমন্ত্রী, পরে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষ। ১৯৬৭ সালে। আর হাল আমলে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। রেশন দোকানে ঈষৎ ভাল চালের পাশে পাঞ্জাবের সেরা লাল গমের বস্তা থাকলেও চাল উড়ে যায়, গম থাকে পড়ে।

আর দাম যখন একই, তখন বাঙালি এক থালা ভাতে ঢাকা ডিম, মাংসখণ্ড ও আলু দিয়ে বানানো বীরভোগ্যা বিরিয়ানি ছেড়ে কোন দুঃখে রোল চিবুবে?‌ চিবুচ্ছেও না। বাজার এখন পুরোপুরি বিরিয়ানির দখলে। সে দীঘা হোক বা দার্জিলিং, স্লোগান আজ একটাই:‌ চেঙ্গিজ, তৈমুর, বাবরের প্রার্থনা পূরণে যা সফল বাঙালির ঘরে ঘরে চাই সেই বিরিয়ানি।‌‌‌‌‌ বাঙালির আজ বিরিয়ানি ছাড়া হারানোর আর কিছু নেই।‌‌


    সৌজন্যেঃ আজকাল

Advertisements