Posts Tagged ‘rabindranath’

‘I don’t understand Imperialism’ says Mamata

November 1, 2012

Advertisements

Mamata’s Gimmick using KKR & Shahrukh Khan

June 17, 2012

 

তঞ্চকতার শেষ কোথায়?

নীলোৎপল বসু

robibar er pata    স্বপ্ন বিক্রির পরিণাম পশ্চিমবাংলার মানুষ গত এক বছরে হাড়ে হাড়ে বুঝতে শুরু করেছেন। গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী ইশ্‌তেহার আর গত এক বছরে ঘটনাবলীর মধ্যে তফাৎটা রাজনৈতিক জ্যামিতির পরিভাষায় প্রায় ১৮০ ডিগ্রি। এমনটা যে হ‍‌তে পারে তা সবারই অজানা ছিল এমনটাও নয় — নয়তো প্রায় দু’কোটি মানুষ কীভাবে বামফ্রন্টকে ভোট দিলেন। কিন্তু সাথে সাথে এটাও নিশ্চয়ই স্বীকার করতে হবে যে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিশ্চয়ই নির্বাচন-পূর্ব তৃণমূলের প্রতিশ্রুতি এবং স্লোগানগুলিকে কিছুমাত্রায় হলেও বিশ্বাস করেছিলেন।

    কিন্তু স্বপ্ন বিক্রি করতে গিয়ে যে তৃণমূলের নিজেদের মুরদে কুলোবে না— সরাসরি বলিউড থেকে মেগাস্টার আমদানি করা হবে এটা বোধহয় কারোরই ধারণার মধ্যে ছিল না। আর প্রশ্নটা তো শুধু চিত্রতারকার নয় জনপ্রিয় চিত্রতারকারা তো আজকাল উপরি আয় করার জন্য অন্তর্বাস থেকে ডিশ টিভি’র বিজ্ঞাপন সব ব্র্যান্ডই এনডোর্স করছেন। অন্তর্বাস আর পশ্চিমবাংলার মধ্যে তফাৎটা আর কত? তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে চলা সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কল্যাণে পশ্চিমবঙ্গ তো কোনো জনসমষ্টি সমৃদ্ধ ভৌগোলিক সত্তা নয় — নিছকই বিপণনযোগ্য একটি পণ্য। এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। যাঁর গান এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের দিনযাপনের সঙ্গী — সেই রবীন্দ্রনাথও হয়তো তাঁর সোনার বাংলার এই পণ্য হয়ে ওঠার বিবর্তন দেখে আঁতকে উঠতেন।

    কিন্তু পশ্চিমবাংলাকে ব্র্যান্ড হিসেবে বেচতে পারার জন্য শাহরুখকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার নিয়োগ করাটা নিশ্চয়ই— ‘পরিবর্তন’। অতীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সলিল চৌধুরী, উৎপল দত্ত, সত্যজিৎ রায় এবং পশ্চিমবাংলার শীর্ষ রাজনী‍‌তিবিদরাই— বিধান রায় থেকে জ্যোতি বসু— এই কাজটা সুচারুভাবে সম্পন্ন করে এসেছেন। দুঃখ হয় আমাদের সংবাদমাধ্যমের সেই কুশীলবদের জন্য যাঁরা বিধানসভা ভোটের আগে নানা বিশেষণে ভূষিত করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে চিহ্নিত করেছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম হিসেবে; ‍যিনি একাই তার বৃষস্কন্ধে পশ্চিমবাংলা নামক অচল ব্র্যান্ডটিকে দেশের মধ্যে উচ্চতার শিখরে পৌঁছে দেবেন ব্যর্থতার পাঁক থেকে তুলে!

(১)

    বছর ঘোরার আগেই তবে কেন রণনীতির এই পরিবর্তন? আসলে এর পিছনে কোনো খামখেয়ালিপনার ভূমিকাই মূল চালিকাশক্তি নয়। এর পিছনে ভারতবর্ষের এবং পৃথিবীরও সামগ্রিক বাস্তবতার একটি পটভূমি রয়েছে। গণশক্তির এ‍‌ই জায়গাতেই অনুজপ্রতিম দেবাশিস চক্রবর্তী মতাদর্শগত ক্ষেত্রে যে গভীর পরিবর্তন আমাদের অর্থনীতি এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করছে তার চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন। সুতরাং তার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।

    আসলে, নয়া উদারবাদী বিশ্বায়নের যে পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে আজকের পৃথিবী চলছে— তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য লগ্নিপুঁজির বিনিয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্রকে প্রতিষ্ঠিত করা যার মধ্যে দি‍‌য়ে নতুন ধরনের পণ্যের জন্য চাহিদা তৈরি করা যাবে। খেলাধুলোর ক্ষেত্রটাও এমনই। আর ক্রিকেট — তা সাদা শার্টপ্যান্ট পরে পাঁচদিন ধরে ক্রীড়া দক্ষতার সুষমা পণ্য হিসেবে মোটেই মনোরঞ্জক নয়। চাই উত্তেজনা— চাই গ্ল্যামারের মিশেল— চাই রঙ, আলো— শরীরী প্রদর্শন। তাই আই পি এল। মার্কিনী বেসবল বা বাস্কেটবল লিগের অনুপ্রেরণায় বা ইউরোপীয় দেশগুলির ফুটবল লিগের বিজনেস মডেলের ধাঁচে— স্পনসরশিপ, এনডোর্সমেন্ট, ফ্রানচাইজিদের হাত ধরে ক্রিকেট দলের কর্পোরেট মালিকানা। আর সঙ্গে অবশ্যই রগরগে উত্তেজনা — আর বলিউডি গ্ল্যামার। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে অবশ্যই কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘কিং শাহরুখ খান’।

    আধুনিক অলিম্পিকের প্রতিষ্ঠাতা ব্যারেন কুভারতিনে আধুনিক ওলিম্পিকের উষালগ্নে ১৮৯৬সালে যে স্লোগান তুলেছিলেন — খেলাধুলোর প্রতিযোগিতায় দেশের জন্য অংশগ্রহণ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ, জেতা-হারাটা গৌণ প্রশ্ন— তা আজকের নব উদারবাদী পরিবেশে সেকেলে হয়ে গেছে। সুতরাং অবশ্য পরিত্যাজ্য। পণ্য এবং বাজার-বিজ্ঞাপন এবং বিপণনই আপাতত ঈশ্বর। অর্থনীতির যে পরিবর্তন সমাজের মধ্যে অপরিসীম বৈষম্য সৃষ্টি করছে তার ছাপ সমাজজীবনে সর্বত্রগামী। খেলাধুলো বা সংস্কৃতি এই ধরনের একটি সর্বব্যাপী অনুপ্রবেশ থেকে কীভাবে মুক্ত থাকতে পারে? আসলে খেলাধুলোকে জড়িয়ে সবসময় একটি গণউন্মাদনার উপাদান থাকে। সেই উপাদানটিকে আরো সক্রিয় করে তুলতে শহরের অনুষঙ্গ পরিচিতি সত্তাকে উস্‌কে দিতে পারা এবং আই পি এল নামক মনোরঞ্জনের একটি সম্পূর্ণ পণ্যের প্যাকেজের জন্য একটি বিরাট বাজারকে সৃষ্টি করতে পারে।

    অনেকেই বিতর্ক করতে পারেন এর মধ্যে আপত্তিটা কোথায়? যুগে যু‍‌গে ব্যবসায়ীরা, শিল্পোদ্যোগীরা তো এটাই করে এসেছেন। যবে থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে বিক্রির জন্য পণ্যের উৎপাদন হচ্ছে — তবেই থেকে এটাই তো দস্তুর। নয়া উদারবাদের প্রবক্তারা দাবি করে থাকেন যে, বিশ্বায়নের যুগে শক্তিশালী, কেন্দ্রীভূত, সঞ্চরণশীল লগ্নিপুঁজিকে চূড়ান্ত দক্ষতায় ক্রিয়াশীল করতে পারাটাই অর্থনৈতিক মুক্তির মোক্ষলাভ ঘটিয়ে দেবে। এখানে সরকারের কোনো ভূমিকা — হস্তক্ষেপ নৈব নৈব চ।

    কিন্তু গত চার দশকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং গত দু’দশকে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে নয়া-উদারবাদী সংস্কারের অভিজ্ঞতা এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, সরকারের এ ধরনের নৈর্ব্যক্তিক জড়বৎ ভূমিকা শুধু প্রচারের বাগাড়ম্বরই নয় — আদপে এটা একটা মিথ। সুতরাং তরল লগ্নিকে অবাধে বিচরণ করতে দেওয়া বাজাররূপী চারণক্ষেত্র সৃষ্টি করে দেওয়াটাই নয়া-উদারবাদী সরকারী সংস্কারের মূল লক্ষ্য। সরকারের ভূমিকা নৈর্ব্যক্তিক তো নয়ই — বরং বাজার এবং নতুন নতুন পণ্যের চাহিদাকে সৃষ্টি করার রাস্তাকে মসৃণ করাটাই তার প্রধান সরকারী কর্তব্য। তাই আজকের পৃথিবীতে — ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। আর সরকার যৎপরোনাস্তি সচেষ্ট থা‍‌কে এই সমস্ত পণ্যের সৃষ্টিকর্তাদের আকাশচুম্বী মুনাফাকে নিশ্চিত করতে।

(২)

    দুঃখ লাগে কিষানজীর জন্য। আনন্দবাজারের সাংবাদিক যখন খানিকটা চমকেই উঠেছিলেন পশ্চিমবাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে তাঁর মনোভাব জানতে পেরে — তার পরবর্তী প্রায় স্বতঃস্ফূর্ত প্রশ্ন ছিল যে ‘বিপ্লবী’ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কীভাবে কংগ্রেস বি জে পি-র মতো শাসকশ্রেণীর দলগুলির সঙ্গে অবলীলাক্রমে ঘর করা একজন নেতাকে পছন্দ করলেন, তার উত্তরে কিষানজী বলেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস যেহেতু একটি আঞ্চলিক দল এবং নেত্রী যেখানে সর্বময়, সেখানে সেই নেত্রীকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের শরিক করে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে তাকে গণস্বার্থে কাজে লাগানো সম্ভব। কিষানজীর এই মন্তব্যের পিছনে মার্কসবাদের কোনো সুদূর যোগা‍যোগও ছিল না, এটা ভিন্ন প্রশ্ন। এবং জীবনের মূল্যে তাকে ঐ ধরনের একটি কপোলকল্পিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দায় মেটাতে হয়েছে, সেটাও গৌণ। মূল প্রশ্ন শুধু কিষানজী নয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিজেকে বামপন্থী বলে বিশ্বাস করে এমন অনেক বুদ্ধিজীবীও তৃণমূল কংগ্রেস বা তার নেত্রীর মধ্যে বামপন্থীসুলভ মেজাজের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। পুরানো খবরের কাগজ ঘাঁটলে এর ভূরিভূরি উদাহরণ সহজেই পাওয়া যাবে।

    কিন্তু তাঁরা যে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের উৎপত্তি, বিবর্তন এবং বিকাশ ঘটেছে তার মূল নির্যাসটাকেই ধরতে পারেননি। ঐতিহাসিকভাবে এই দেশে এবং বামপন্থার শক্ত জমি পশ্চিমবাংলার দক্ষিণপন্থীদের কাছে অনিবার্য একটি দাবি ছিল — তৃণমূল কংগ্রেস এবং তার সর্বময় কর্ত্রীকে সৃষ্টি করা। তারা তাই করেছে। সুতরাং হিলারি ক্লিটন থেকে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম সবাই এক প্রক্রিয়ায় নুড়ি বেছানোর কাজ করেছেন। আর তাই আজকের পশ্চিমবঙ্গে — এই ‘পরিবর্তন’।

(৩)

    পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের কিচ্ছু করার নেই। আমাদের দেশের শাসকশ্রেণী যে রাস্তায় দেশের অর্থনীতি — সমাজ-সংস্কৃতিকে পরিচালিত করতে চায় তার অন্যথা কিছু করা এ‍‌ই সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। বামপন্থার প্রয়োগের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিটি পদক্ষেপকে ‘পরিবর্তন’ না করে তাদের চলা সম্ভব নয়। এটাই দক্ষিণপন্থার এই সময়ের চাহিদা। সশব্দ কিছু রণহুঙ্কার, বড়জোর কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু শেষ বিচারে সৃষ্টি কখনো স্রষ্টাকে অস্বীকার করতে পারে না। এদেশের দক্ষিণপন্থীদের প্রয়োজন ছিল বামপন্থীদের দুর্বল করা — সেই জন্যই এই সরকার। সুতরাং আজকের পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে সুদে-আসলে তার ঋণ শোধ করতে হবে।

(৪)

    সুতরাং আই পি এল। আই পি এল-এ কোলকাতা নাইট রাইডার্সের জয় — আর পশ্চিমবঙ্গের ব্র্যান্ড অ্যামবাসাডার শাহরুখ খান। বামপন্থীদের হটাবার জন্য দরকার ছিল — ‘মা-মাটি-মানুষ’। ভোটের আগে জমির প্রশ্ন জরুরী ছিল — আর আজ প্রয়োজন ঋণগ্রস্ত কৃষকদের আত্মহত্যাকে অস্বীকার করা, জমির ঊর্ধ্বসীমার সিলিং তুলে দেওয়া, রেগার কাজ থেকে গ্রামীণ গরিবদের বঞ্চিত করা — তাই হচ্ছে।

    কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অন্য জায়গায়? সততার প্রতীকের কী হলো? আই পি এল-কে ঘিরে সরকার/কর্পোরেট ফ্রানচাইজিদের আর্থিক নয়ছয়কে নি‍‌য়ে যে তীক্ষ্ণ প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে আমরা করদাতারা কি সে সম্পর্কে নীরব থাকতে পারি? ক্রিকেট যদি দেশের তাবড় কর্পোরেটদের মুনাফার লীলাক্ষেত্র হয়ে ওঠে নিজস্ব কবজির জোরে দেশের আইন মেনে, করদাতাদের রক্তজল করা ট্যাক্সের টাকাকে স্পর্শ না করে তাহলে বড়জোর নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা যায় — এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি সজোরে উচ্চারণ করা যায় না। কিন্তু যে তথ্য সামনে উঠে আসছে তা তো ভয়ঙ্কর।

(৫)

    এই তথ্য বামপন্থীদের নয়, সংসদের অর্থবিষয়ক স্থায়ী কমিটির। ২০১১ সালের আগস্ট মাসে ‘ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট এগজামিনেশন অ্যান্ড রিলেটেড ম্যাটার কনসার্নিং আই পি এল/বি সি সি আই’ শীর্ষক ৩৮তম রিপোর্ট তারা পেশ করে লোকসভায়। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই স্থায়ী সমিতির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যই ছিলেন বর্তমান সংসদের গঠন প্রকৃতি অনুযায়ী কংগ্রেস বা বি জে পি-র মতো নয়া উদারবাদী নীতির সমর্থক দলের সদস্য। খুঁজে পেতে দেখলেও তিনজনের বেশি বামপন্থী সদস্য একত্রিশ সদস্যের এ‍‌ই কমিটিতে জায়গা পাননি। আর কমিটি রিপোর্ট তৈরি করার সিংহভাগ সময়ই তৃণমূল কংগ্রেস নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় রাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবার আগে ১২ই জুলাই পর্যন্ত এই কমিটির সদস্য ছিলেন।

    এই কমিটির সুপারিশের ছত্রে ছত্রে তীক্ষ্ণ সমালোচনা করা হয়েছে বি সি সি আই-র পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আই পি এল-র বিরুদ্ধে। রি‍‌পোর্ট বলছে — একটি খেলার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার আড়ালে অর্থনৈতিক এবং আর্থিক অনিয়ম, দেশের কর সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন, বিদেশী মুদ্রা বিনিময় সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন, টাকাপয়সা অবৈধভাবে ছড়ানোর বিরোধী আইনের লঙ্ঘন এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণবিধির লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে উঠে এসেছে।

    কমিটি তার রিপোর্টে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ‘ভদ্রলোকের খেলা’ হিসেবে পরিচিত দেশের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক‍‌টি খেলার নামকে যেভাবে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে, মাঠের বাইরে দেশের আইন লঙ্ঘন করার মধ্যে দিয়ে, তাকে নিন্দা করার কোনো ভাষা নেই।

    কমিটি দেখিয়েছে যে, বি সি সি আই-কে ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল অবধি তিনবছর ২২৫.২৮ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে তাদের মুনাফার উপরে, কারণ খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতা একটি জনহিতকর কাজ এই অজুহাতে। বি সি সি আই ২০০৮-০৯ এবং ২০০৯-১০ সালে যথাক্রমে ৩০৭.৩৩ কোটি টাকা এবং ২১৬.৬৪ কোটি টাকা ঐ একই অজুহাতে আয়কর থেকে ছাড়ের দাবি করেছে। আয়কর বিভাগ ২০০৬-এ জনহিতকর কাজের এই সংজ্ঞা আই পি এল-র ক্ষেত্রে প্রত্যাহার করে নিলেও তিন বছর তাদের প্রদেয় কর সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তই টানতে পারেনি। এ‍‌ই তথ্যগুলির থেকে কমিটি এই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, বি সি সি আই-র প্রতি আয়কর বিভাগ প্রচণ্ড শিথিল মনোভাব দেখিয়েছে।

    প্রাসঙ্গিকভাবে তুলনা করা যেতেই পারে যে, পেট্রোলের দামে খুচরো মূল্যের ৪৭ শতাংশই কর হিসেবে সংগৃহীত হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমানে উঠেপড়ে লেগে‍‌ছে ডিজেল এবং রান্নার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সেখান থেকেও কর সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য।

    কমিটি এই প্রশ্নেও বিস্ময় প্রকাশ করেছে যে, সারা দুনিয়া ভারতবর্ষের ক্রিকেটের ব্যবসায়িকরণ এবং পণ্যায়ন সম্পর্কে অবহিত থাকলেও — কোটি কোটি টাকা মুনাফা অর্জনে স্পনসরশিপ মিডিয়া রাইট বা বিজ্ঞাপনের চুক্তি, এনডোর্সমেন্ট ইত্যাদি ব্যাপক ব্যবসায়ীক উপাদানগুলি সম্পর্কে আলোচনা হলেও — দেশের সরকার এবং আয়কর বিভাগ এ সমস্ত প্রশ্নে একেবারেই অজ্ঞের ভূমিকা নিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী এবং সরকার-ঘনিষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা বি সি সি আই এবং আই পি এল-র সঙ্গে যুক্ত আছেন।

    আরো অজস্র নির্দিষ্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে পাঠকদের তথ্য ভারাক্রান্ত করার জন্য। কিন্তু তার প্রয়োজন নেই। খালি শাহরুখ খানের মালিকানায় চলা কলকাতা নাইট রাইডার্স দলের আর্থিক অনিময় নিয়ে যে তদন্তের নির্দেশ এই সংসদীয় কমিটি সামনে এনেছে তা উল্লেখ করা যেতে পারে। কমিটি বলছে — রাজস্থান রয়্যালস, কলকাতা নাইট রাইডার্স, কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ান্‌স এর মত আই পি এল ফ্রানচাইজিগুলি তা‍দের বিনিয়োগ মরিশাস, বাহামাস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের মতো করছাড়ের স্বর্গরাজ্য মারফত ঘুর পথে নিয়ে এসেছে। অবাক কাণ্ড যে, এই কর্পোরেট সংস্থাগুলির এই অনিয়মের জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বা ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন বোর্ডের মতো সংশ্লিষ্ট আর্থিক নিয়ামক সংস্থাগুলির থেকে অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেনি। পরিশেষে কমিটি সরকারকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে এই অনিয়মগুলির তদন্ত করতে।

(৬)

    এখনো কলকাতার রাস্তায় খুঁজলে প্রচুর কাট-আউট এবং হোর্ডিং খুঁজে পাওয়া যাবে — মুখ্যমন্ত্রীর পূর্ণাবয়ব ছবি সংবলিত। তিনি আছেন সর্বত্র। ন্যায় ও সততার প্রতীক হিসেবে বিজ্ঞাপিত হয়ে। আই পি এল নয়া-উদারবাদী — বাজারসর্বস্ব নীতির ক্লেদাক্ত বিজ্ঞাপন। তথ্যের ভিত্তিতে সংবলিত রিপোর্ট তাই এই ক্লেদ, এ‍‌ই দুর্গন্ধকে আড়াল করতে পারেনি — করেওনি। কিন্তু আর্থিক অনিয়মের এই ক্লেদকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেওয়ার কাজ কেন করলো পশ্চিমবাংলার সরকার। পশ্চিমবাংলার ঋণগ্রস্ত আত্মঘাতী কৃষক তাদের জীবনযন্ত্রণার বাস্তবতার স্বীকৃতি পায় না। কিন্তু অনিয়মের ভিত্তিতে মুনাফা অর্জনকারী কর্পোরেট সত্তার একটি অংশ পায় আমাদের ক্রিকেটাররা। আড়াই লক্ষ টাকা দিয়ে সোনার চেন উপহার তাদেরই — এটা কি তেলা মাথায় তেল দেওয়া নয়? রাজ্যপাল বলেছেন কলকাতা নাইট রাইডার্স-র আই পি এল বিজয় মুখ্যমন্ত্রীর পরিবর্তনের স্লোগানের লক্ষ্যপূরণ। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিজয় উৎসবের মধ্যমণি।

    এই তঞ্চকতার শেষ কোথায়?

Harrowing Experience of the People in Nine Months

March 6, 2012

 

Subhash Chandra, Tagore & Mahajati Sadan

January 23, 2012

 

[Click above to enlarge]