Posts Tagged ‘rss’

Sangh-Inspired Film Censor Board

July 13, 2017

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে কোপ
তীব্র ক্ষোভের মুখে সেন্সর বোর্ড

নয়াদিল্লি ও কলকাতা, ১২ই জুলাই– তাঁকে নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্রে কয়েকটি অতি সাধারণ শব্দেও সেন্সর বোর্ডের নিষেধাজ্ঞায় বিস্মিত অমর্ত্য সেন বলেছেন, এ থেকে প্রমাণ হচ্ছে দেশ এক স্বৈরাচারী রাজত্বের হাতে চলে গেছে। দেশের পক্ষে কী ভালো তা তারাই একমাত্র স্থির করবেন এবং চাপিয়ে দেবেন দেশের মানুষের ওপরে।অমর্ত্য সেনের জীবন ও কাজ নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র ‘দি আর্গুমেনটেটিভ ইন্ডিয়ান’—এর পরিচালক সুমন ঘোষকে সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন জানিয়েছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ বাদ দিতে হবে। পরিচালক জানিয়েছেন, অন্তত চারটি শব্দ বাদ দিতে বলা হয়েছে: গোরু, গুজরাট, ভারত সম্পর্কে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, হিন্দু ভারত। কলকাতায় সেন্সর বোর্ডের দপ্তরে তিন ঘণ্টা ধরে তথ্যচিত্রটি খুঁটিয়ে দেখার পরে বোর্ডের তরফে ওই রায় দেওয়া হয়েছে। পরিচালক বুধবার বলেছেন, তাঁকে মৌখিক ভাবেই ওই শব্দগুলি বাদ দিতে বলা হয়েছে। আমি এ ব্যাপারে আমার অপারগতার কথা জানিয়েছি।

পরিচলাক সুমন ঘোষ বলেছেন, তথ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর ছাত্র ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর কথোপকথনের ধাঁচে। এই আলোচনার মধ্যে থেকে কয়েকটি শব্দ বাদ দিলে তথ্যচিত্রের মর্মবস্তুই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি সেন্সর বোর্ডের লিখিত বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করছি। মুম্বাইয়ে রিভিউ কমিটিকে পাঠাবে কিনা, তা-ও দেখতে হবে। তবে যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমার উত্তর হবে একই। হয়তো বিষয়টি মিটে যাবে, কিন্তু আমি কোনও শব্দ সরিয়ে নেব না। সুমন ঘোষ নিজেও অর্থনীতির শিক্ষক। ২০০২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত ১৫ বছরে ছবিটি নির্মিত।

অমর্ত্য সেন নিজে এই ঘটনা জেনে ‘বিস্মিত’। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় তিনি বলেছেন, এমনিতে ‘গোরু’ আমার খুব পছন্দের শব্দ এমন নয়। আসলে গোরু নয়, আপত্তি গুজরাট নিয়ে। এই নয় যে গুজরাট শুনলেই ওঁরা আপত্তি করবেন। ২০০২-এ গুজরাটে কী ঘটেছিল সেটা বলেছি বলে এই আপত্তি।

জানা গেছে, তথ্যচিত্রে গুজরাটের ২০০২-র ঘটনাবলীর উল্লেখ এসেছে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে অমর্ত্য সেনের একটি বক্তৃতায়। সেই ভাষণে গণতন্ত্রের গুরুত্বের কথা বোঝাতে গিয়ে গুজরাটে সরকারি মদতে অপরাধের কথা এসেছিল। এই তথ্যচিত্র ইতিমধ্যেই লন্ডন ভারতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে।

কৌশিক বসু মন্তব্য করেছেন, ভারতের মতো দেশের মর্যাদার সঙ্গে, অমর্ত্য সেনকে সেন্সর করা, মেলে না। ভারত যেসব দেশের প্রতিনিয়ত সমালোচনা করে থাকে, এই ব্যবহার তাদের সঙ্গেই তুলনীয়।

সেন্সর বোর্ডের নির্দেশ নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। বিশিষ্ট শিল্পী, বুদ্ধিবৃত্তির জগতের মানুষজন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, কোন্‌ ফতোয়ায় সেন্সর বোর্ড চলছে। বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এদিন বলেন, সেন্সর বোর্ড একটি রাজনৈতিক দলের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাঁবেদার সংগঠনের কাজ করছে। অমর্ত্য সেন কী বলবেন, তা-ও কি ওঁরা ঠিক করে দেবেন নাকি? এ হলো মূর্খামি। এ শুধু সিনেমা জগতের ব্যাপার নয়, সমস্ত গণতান্ত্রিক মানুষেরই উচিত এর জোরালো প্রতিবাদ করা।

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, এ তো এক ধরনের ফ্যাসিবাদ। যাঁর মুখের শব্দ নিয়ে আপত্তি করা হচ্ছে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এক ব্যক্তি। সুতরাং এ চরম বোকামিও। তবে এই সরকারের কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ ক্রমশই আসতে থাকবে।

সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ গোরু বা হিন্দুত্ব উচ্চারণ করেছেন বলে তথ্যচিত্র বন্ধ হয়ে যাবে? এ কী করে সম্ভব? ওরা ঠিক করছে আমরা কী খাব, কী পরবো, কী বলব, কার সঙ্গে প্রেম করবো, কাকে বিয়ে করব; এখন ওরা ঠিক করতে চাইছে তথ্যচিত্রে কোন কথা আমরা শুনবো

অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্রে এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে অনীক দত্তের ছবি ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ নিয়ে আরো এক বিতর্ক। এই ছবির রিলিজ এক সপ্তাহ পিছিয়ে গিয়ে হচ্ছে ২১শে জুলাই। ছবির এক প্রযোজক সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, সেন্সর বোর্ড ‘রামরাজ্য’ শব্দ ব্যবহার আপত্তি জানিয়েছে। ‘রামরাজ্য’ শব্দটি বাংলায় নানা দ্যোতনায় ব্যবহার হয়। কিন্তু বি জে পি-রাজত্বে এখন এই শব্দের ব্যবহারও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবির প্রযোজক-পরিচালকরা এ নিয়ে তেমন কোনও মন্তব্য না করলেও জানা গেছে, ‘রাম’ শব্দটি বাদ দেবার জন্যই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিচালকের আপত্তি থাকলে তাঁকে রিভিউ কমিটির কাছে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন করা হচ্ছে না বলেই এদিন জানা গেছে।

সেন্সর বোর্ডের মাথায় এখন পহলাজ নিহালনি। তিনি খোলাখুলি বি জে পি-র সমর্থক। একের পর এক ছবির ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী, হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোর্ড আপত্তি জানিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবারই চিত্র পরিচালক প্রকাশ ঝা বলেছেন, নিহালনি ব্যক্তি হিসেবে কী করছেন, তা বড় কথা নয়। একটি মতাদর্শ পিছনে কাজ করছে।

অমর্ত্য সেন সম্পর্কে বি জে পি ও সঙ্ঘ পরিবারের মৌলিক আপত্তিই রয়েছে। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে দেশদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করে বি জে পি-র তরফ থেকে বিশেষ করে সোশ‌্যাল মিডিয়ায় লাগাতার প্রচার করা হয়ে থাকে।

Advertisements

Politics of Cashless Economy

December 29, 2016

নগদহীন ব্যবস্থার অর্থনীতি

মানব মুখার্জি

২০১৬-র ৮ই নভেম্বরের প্রায় মধ্যরাতের ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেন এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক—এরও কারণ তিনি বলেছিলেন। আর পাঁচজন আর এস এস নেতার মতই তিনি সচরাচর সত্য ভাষণ করেন না। এক্ষেত্রেও করেননি — বললেন ‘পাকিস্তানকে জব্দ করার জন্য এ কাজ করেছেন’। পরে বললেন, ‘সন্ত্রাসবাদীদের আঘাত করতে এই কাজ করেছেন’। বাজারে এখন পাকিস্তান বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার কথা ভালো ‘খায়’ তাই প্রথমে এটা। দেশের মানুষ কিন্তু এটা খেলো না। তারপর বললেন কালো টাকা উদ্ধার করার জন্য এটা করেছেন। যেটা কিছুটা হলেও মানুষ খাচ্ছে। কারণ দেশের অর্থনীতিতে কালো টাকা একটা বাস্তব বিষয়। চোখের সামনে বেআইনি বড়লোকী দেখে মানুষ যারপর নাই ক্ষুব্ধ। কিন্তু প্রশাসক হিসাবে তার এবং তার সরকারের অপদার্থতা গোটা বিষয়টাকে চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে গেছে।

নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের ১৩০কোটি মানুষের ওপর একটি অর্থনৈতিক পারমাণবিক বোমার মতো ফেটে পড়েছে। গোটা অর্থনীতি বিপর্যস্ত। স্বাধীন ভারতবর্ষে এতবড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় আর কখনও হয়নি। আর ক্ষয়ক্ষতির একটা বড় অংশের মেরামতিও হবে না। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী তার গোটা সরকার এবং অনুগত কর্পোরেট এবং তাদের মিডিয়া সমস্বরে বলছে আসলে এর মাধ্যমে আমরা নাকি মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক (Cashless Economy) ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি। অবশেষে আমরা আধুনিকতার দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

এই সমস্ত দাবি-পালটা দাবি, রাজনৈতিক কোলাহল ছেড়ে আমাদের বোঝা দরকার — আসলে নোট বাতিলের মধ্যে দিয়ে কি হলো। সরকার আসলে দেশের সমস্ত মানুষের কাছে যা নগদ টাকা ছিল সেই টাকা তুলে নিল। ব্যাঙ্কেই তা জমা পড়ল, কিন্তু মানুষ চাইলেই সেই গোটা টাকাটা নিজের হাতে ফিরিয়ে নিতে পারছে না। যেহেতু ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোটে দেশের মোট টাকার ৮৬%, কাজেই বলা যায় টাকার সিংহভাগ এখন ব্যাঙ্কের হাতে, মানুষের হাতে না। যে টাকাটা এলো, এর মধ্যে একটা অংশ কালো টাকা, তবে সেটা খুব ছোট অংশ। কারণ টাকাতে কালো টাকা রাখা হয় খুব কম। কালো টাকা জমি-সোনা-বাড়ি এই সব কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে থাকে। নানাভাবে কালো টাকা বিদেশে চলে যায়, রূপান্তরিত হয় বিদেশি মুদ্রায় যা আমাদের সরকারের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আবার রূপান্তরিত বিদেশি মুদ্রা বিদেশি বিনিয়োগ হিসাবে দেশে ফিরে আসে। অসংখ্য সংস্থা আছে যারা সরকারের নজর এড়িয়ে কালো টাকাকে সাদা করে দেয় যাকে ইংরেজিতে বলে Money Laundering.

কাজেই কালো টাকা-ঠাকা নয়, এর মধ্য দিয়ে সরকার দেশের সমস্ত জমা নগদ ব্যাঙ্কজাত করে দিল। এখানেই সরকারের শেষ দাবিটিকে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে — আমরা মুদ্রাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যাওয়ার চেষ্টা করছি।

আসলে মুদ্রাহীন ব্যবস্থার মানে কি? ক্রেতার কাছে কোনো নগদ টাকা থাকবে না। সে কার্ডের (ডেবিট বা ক্রেডিট) মাধ্যমে জিনিস কিনবে। এমনকি ইন্টারনেট সংবলিত একটি মোবাইল ফোন থাকলেই (যেমন পে টি এম) সে জিনিস কিনতে পারবে। নোটের কোনো দরকার থাকবে না। এটা ইতিমধ্যেই আমাদের দেশে আছে। এই যে নগদহীন দেড় মাসে ভারতবর্ষের বড়লোক এমনকি মধ্যবিত্তদের একটা অংশেরও খুব একটা অসুবিধা হয়নি এর জন্য। এ দেড় মাসে বাকি সব কিছুর চাহিদা কমেছে বেড়েছে কেবল কার্ড এবং পে টি এমের। নগদহীন অর্থনীতির মানে পরিমাণটা বাড়ানো।

আমাদের দেশে যত খুচরো লেনদেন হয় তার শতকরা ৯৮% হলো নগদে, আর লেনদেনের টাকার পরিমাণের ৭০% হলো নগদ টাকা। নগদহীন অর্থনীতি মানে এই পরিমাণটাকে দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। এই গোটা কাণ্ডটি ঘটানোর জন্য যে কার্ড দরকার আমাদের দেশের সেই কার্ডের মোট সংখ্যা ৭৫ কোটি। কিন্তু কার্ডের মালিকের সংখ্যা এর ধারে কাছেও না। কারণ কার্ডের মালিকদের অধিকাংশরই একাধিক কার্ড। একাধিক ব্যাঙ্কের এবং ডেবিট এবং ক্রেডিট উভয় ধরনের। (ডেবিট কার্ড হলো ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে একজনের যত টাকা থাকে সর্বাধিক প্রায় সেই পরিমাণের টাকা সে কার্ডের মাধ্যমে খরচ করতে পারবে। ক্রেডিট কার্ডে ব্যবহার করা যায় ব্যাঙ্কে এক পয়সাও না থাকলে। একটি সর্বচ্চোসীমা কার্ড কোম্পানি নির্দিষ্ট করে দেয়। এই পরিমাণের টাকা এই কার্ডের মাধ্যমে একজন খরচ করতে পারে এবং নির্দিষ্ট তারিখে প্রতি মাসে সে যত টাকা নিয়েছে সেই টাকা শোধ করতে হয়। শোধ না করলে বিপুল পরিমাণের সুদ দিতে হয়। তবে দু’ধরনের কার্ডেই প্রতি কেনাকাটায় একটি সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। বছরে একবার কার্ডটিকে রিনিউ করতে হয় টাকা দিয়ে) আপাতত আমাদের ঘোষিত লক্ষ্য দেশের অধিকাংশ মানুষকে কার্ড সংবলিত করতে হবে।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চলে পে টি এম। আগেই সেখানে টাকা রাখতে হয় ব্যাঙ্ক থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তারপর মোবাইল ফোন থেকে টাকা দিতে হয়। এছাড়াও একটি আধা নগদহীন ব্যবস্থা আছে, সেটা বেশ চালু পদ্ধতি। আমার পকেটে টাকা থাকবে না, কিন্তু কোনো একটি জিনিস কিনতে গেলে এ টি এম (Automated Teller Machine) কার্ড দিয়ে সেই পরিমাণ টাকা এ টি এম থেকে তুলে নিয়ে কিনে নাও। কিন্তু এর প্রতিটি আম-ভারতীয়র ক্ষমতার বাইরে। আমাদের দেশের মতো বিশাল একটি দেশে এ টি এম-এর সংখ্যা মাত্র ২.৩লক্ষ। কার্ড ব্যবহার করতে হলে বিক্রেতার কাছে নেট সংবলিত একটি টার্মিনাল থাকতে হবে। এরকম যন্ত্র এই মুহূর্তে দেশে আছে মাত্র ১৪ লাখ দোকানে। আর পে টি এম-এর ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতা দু’জনের কাছেই অন্তত ৩জি নেটওয়ার্ক সংবলিত স্মার্টফোন থাকতে হবে।

কবে ১৩০কোটির দেশ নগদহীন হবে? জনসংখ্যার তুলনায় এই ব্যবস্থা আমাদের দেশে খুব দুর্বল, এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা একটি দেশের মধ্যে পড়ি আমরা। আর এর থেকেও বড় পরিকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। দেশের কত অংশে নেটওয়ার্ট আছে? দেশে টেলিফোন ব্যবহার করতে পারে কত মানুষ? ৫১% গ্রামে টেলিফোন নেই। লেখাপড়া জানে না কত জন? প্রায় ৩০কোটি। ইংরেজি পড়তে পারে কত অংশ? ২০%। দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে কত অংশের মানুষ? ২৭কোটি। ২৩.৩ কোটি মানুষের কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। এর মধ্যে ৪৩% ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনদিন কোনো লেনদেন হয় না। কার্ড বা এ‍‌ টি এম বা স্মার্টফোনের সংখ্যা যা, তাও প্রধানত শহরাঞ্চলে — বিস্তীর্ণ গ্রাম প্রায় মরুভূমি। তবে কি করে আমরা নগদহীন হব?

একটি নগদহীন অর্থনীতি করা যায় বা করার প্রয়োজন এরকম কথা দু’দিন আগেও দেশের সাধারণ মানুষ ভাবেনি। এগুলো আমরা নতুন শুনছি। আমরা জানছি সুইডেনই নাকি পৃথিবীতে প্রথম নগদহীন দেশ হবে। আমরাও খোঁজ নেবার চেষ্টা করছি — কি করে সুইডেন এরকম হলো? এবং বুঝবার চেষ্টা করছি আমরা কি করে সুইডেন হব? সুইডেন মাথা পিছু আয়ে পৃথিবীর সব চেয়ে বড়লোক একটি দেশের মধ্যে পড়ে। মানব উন্নয়ন সূচকেও সুইডেন প্রথম সারিতে। সুইডেনের সরকার ঘোষণা করেই নগদহীন অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। অবশ্য এর মানে এই না যে সুইডেনে নগদ টাকার কোনো ব্যবহার নেই। সুইডেনের ৫৯% বেচাকেনা হয় নগদ ছাড়া। এ প্রশ্নে সর্বোচ্চ জায়গায় আছে সিঙ্গাপুর ৬১%। আমাদের দেশে এটা মাত্র ২%। কিন্তু এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা ভালো এটা প্রধানত খুচরো বিক্রি। দেশের বড় ব্যবসা বাণিজ্যের একটা বড় অংশ চিরকালই নগদহীন। টাটা স্টিল যখন ইন্ডিয়ান অয়েল থেকে জ্বালানি কেনে বা আম্বানিরা রেলের মাধ্যমে মাল পাঠালে নগদে রেলকে ভাড়া দি‍‌তে হয় না। সেটা সরাসরি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয়। যত সমস্যা সাধারণ ক্রেতার। গোটা পৃথিবীতেই এটা নিয়ম।

সরকার বলছে বলেই সুইডেনে সবাই নগদহীন পথে যাচ্ছে তা না। যদি টেকনোলজি জানা থাকে তবে এটি খুবই সুবিধার। কোন টাকা পয়সা সঙ্গে রাখার দরকার নেই, চুরি ছিনতাই, পকেটমারের দুশ্চিন্তা নেই। এখনও সুইডেনে নগদ চলে দূরবর্তী গ্রামীণ অঞ্চলে এবং বয়স্ক যারা নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করতে পারে না তারা নগদ ব্যবহার করে। এটাও কমে আসছে। সুইডেনের ব্যাঙ্কগুলো তাদের এ টি এম-গুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এখন নগদ নেয় না।

কিন্তু এখানেই শেষ না। উন্নত পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যাঙ্কে সুদের হার চিরকালই খুব কম। এখন সেই সুদের হারকে ঋণাত্মক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তুমি ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে তোমাকে ব্যাঙ্ক কোনো সুদ দেবে না। বরং তোমার টাকা রে‍‌খেছে বলে ব্যাঙ্ক ‍‌তোমার টাকা কাটবে। তোমার জমা রাখা টাকা প্রতি বছরে কমবে। এই ঘটনা প্রধানত ঘটছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে। এবং দেখা যাচ্ছে যে, যত Cash Less তত তার সুদের হার কম। এই বছরের আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী ঋণাত্মক সুদের হার — ডেনমার্ক -০.৬৫%, জাপান, -০.১০%, সুইজারল্যান্ড -০.৭৪%, সুইডেন -০.৫০%। যে সমস্ত দেশে নগদহীন অর্থনীতির প্রসার বেশি হয়েছে সেখানে ব্যাঙ্কের সুদ কমতে কমতে ঋণাত্মক জায়গায় গিয়ে পৌঁচেছে, দু’টি সম্পর্কযুক্ত। সুদের হার কম মানে বিনিয়োগের জন্য অঢেল টাকা খুব কম সুদে পাওয়া যায়

এখন সুইডেনে বা নগদহীন অর্থনীতির যে কোনো নাগরিকের সামনে কি কি পথ খোলা রইল। তার অর্জিত অর্থ নগদে সে ঘরে রাখতে পারবে না, কারণ সেই নগদ টাকায় সে কোনো কিছু কিনতে পারবে না, কারণ নগদে কেউ কিছু বিক্রি করবে না। একটাই পথ গোটা টাকাটা তাকে ব্যাঙ্কে রাখতে হবে। কিন্তু ব্যাঙ্কে রাখলে ঋণাত্মক সুদের কারণে তোমার টাকার একটা অংশ ব্যাঙ্ক কেটে নেবে, তোমার সঞ্চয়ের পরিমাণের ক্রমাগত ক্ষয় হবে। অন্য পথ হলো সঞ্চয়ের টাকা নগদহীন ভাবে খরচ কর। যদি ব্যাঙ্কে টাকা রেখে দাও তবে সে টাকা নামমাত্র সুদে বিনিয়োগকারীর হাতে পৌঁছবে। আর যদি জিনিস কিনে সেই টাকা খরচ করো তাহলেও তোমার টাকার একটি অংশ মুনাফা হিসাবে মালিকের হাতে পৌঁছবে। অর্থাৎ তুমি যাই করো লাভ মালিকদের, তোমার নয় — অথচ টাকার মালিক তুমি।

আধুনিক পৃথিবীতে যে কোনো মানুষের সবচেয়ে মৌলিক যে অর্থনৈতিক অধিকার আছে তা হলো নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে আয় করার অধিকার। এই আয়ের একটি ছোটো অংশ রাষ্ট্রকে কর হিসাবে দিয়ে বাকি টাকাটার মালিক তুমি। তুমি ঠিক করবে সেই টাকা দিয়ে তুমি কি করবে।

সেই টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে তুমি ক্রেতা ঠিক করবে। কি কিনবে তা ঠিক করবে। তোমাকে এই অধিকার দেয় রাষ্ট্র। এক টুকরো কাগজে রাষ্ট্রের হয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক লিখে দেয় এই কাগজ যার হাতে সে এই টাকার মালিক। সেই পরিমাণটিও কাগজে ছাপা থাকে। এই হলো নগদ টাকা। এই গোটা প্রক্রিয়ায় সে স্বাধীন এবং নোটের বিনিময়ে পণ্য বিক্রি করবে যে বিক্রেতা সেও স্বাধীন। দুই স্বাধীন নাগরিকের মধ্যে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি থাকবে না। নগদহীন অর্থনীতিতে এই মৌলিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অবসান। এক, তুমি তোমার টাকা নিয়ে কি করবে সেটা পুরোপুরি তুমি ঠিক করবে না। সেটা ঠিক করবে সরকার অথবা সরকারের হয়ে ব্যাঙ্ক, সে ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্ত হতে পারে, বেসরকারিও হতে পারে, দেশি ব্যাঙ্ক পারে, বিদেশি ব্যাঙ্কও হতে পারে।

ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যেকার স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেরও কোনো অস্তিত্ব নগদহীন ব্যবস্থায় থাকবে না। তুমি বিক্রেতাকে সরাসরি জিনিসের দাম দিতে পারবে না। তোমার হয়ে তৃতীয় পক্ষ দাম দেবে। সে তৃতীয় পক্ষ হতে পারে ব্যাঙ্ক হতে পারে যে কোম্পানির কার্ড তুমি ব্যবহার করছ সেই কোম্পানি। তুমি বিক্রেতাও সব সময় স্বাধীনভাবে ঠিক করতে পারবে না। বিজ্ঞাপন দিয়ে ডিসকাউন্ট দিয়ে কার্ডের কোম্পানি তোমাকে প্রভাবিত করবে বিশেষ কোম্পানির জিনিস কিনতে। এমনকি চরম ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ বিক্রেতাকে টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে সে। তুমি কোনো একটি সংগঠন, বা রাজনৈতিক দলকে টাকা দিতে চাও। কার্ডের কোম্পানি সরকারি বির্দেশ উল্লেখ করে সেই টাকা দিতে অস্বীকার করতে পারে। পৃথিবী জোড়া কার্ডের ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে দু’টি মার্কিন কোম্পানি — ভিসা এবং মাস্টারকার্ড। এদের ক্ষমতা বোঝাবার জন্য ভিসার উদাহরণ দেওয়া যায়। ২০১৫ সালে গোটা পৃথিবীর ১লক্ষ কোটি লেনদেন হয়েছে ভিসার মাধ্যমে। এতে লেনদেন হয়েছে ৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর ২৫০০০ ব্যাঙ্কের হয়ে ভিসা কাজ করে। এরা সিদ্ধান্ত ক’রে উইকিলিক্সের ‍‌(যারা সমস্ত গোপন ইলেকট্রনিক বার্তা ফাঁস করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে বেআব্রু করে দিয়েছে।) টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। একইভাবে কয়েকটি বিশেষ রাশিয়ান ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিক লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে এরা। এবং এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ মাগনায় কোনো কাজ করে না। নগদ ভিত্তিক অর্থনীতিতে ক্রেতা নগদে দাম দেয়, বিক্রেতা তার মাল দেয়। এর মধ্যে আর কোনো টাকা পয়সার লেনদেন থাকে না। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থায় এই তথাকথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ প্রতিটি লেনদেন থেকে টাকা পায়, ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে। এবং এই টাকা তারা দিতে বাধ্য।

আজ গোটা দুনিয়া জুড়ে নগদহীন অর্থনীতির দাবিতে সমস্বরে কোলাহল করা হচ্ছে। তাতে গলা মিলিয়েছে রাজনৈতিক নেতা, বড় বড় কোম্পানি, নিজের ভালো-মন্দ না বোঝা কিছু মূর্খ মানুষ। কিন্তু সবচেয়ে সজোরে চেঁচাচ্ছে এই ‘তৃতীয় পক্ষ’ কোম্পানিগুলো। নগদ ১০টাকা দিয়ে কেউ যদি এক কিলো আলুও কেনে তাহলে এই তৃতীয় পক্ষরা মনে করে তাদের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল।

পৃথিবীতে ২০০৮ থেকে লাগাতার সংকট চলছে — নতুন বিনিয়োগ নেই, বাজারে স্থায়ী মন্দা, কর্মসংস্থান তলানিতে। তথাকথিত নগদহীন অর্থনীতি এবং সুদের হার শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে চেষ্টা চলছে মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদকে ব্যবহার করে বাজার চাঙ্গা করতে, নতুন বিনিয়োগ ব্যবস্থা করতে। এবং এই প্রক্রিয়াটাই এক কথায় একটি নিকৃষ্ট রাহাজানিতে পরিণত হয়েছে।

এই রাহাজানির তালিকায় আমাদের দেশ থাকবে না, এ হয় না। নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রাথমিক কারণও একটি বিশুদ্ধ রাহাজানি। বেসরকারিকরণের ঢাক গত ২৫বছর ধরে বাজানো হচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে এখনও নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো। দেশের মোট আমানতের ৭২%-ই আছে ১৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছে। মোদীর ‘আচ্ছে দিনের’ ছোঁয়া এই ব্যাঙ্কের গায়েও লেগেছে। ২০১৪-১৫ সালে এই ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত লাভের পরিমাণ ছিল ৩৬হাজার কোটি টাকা। আর এ বছরে লাভ উলটে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৮হাজার কোটি টাকা। এটা যে কোনো ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে একটি অশনি সংকেত। বিপদটা সরকারও বুঝেছিল।

কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের এই দুরবস্থার একটিই কারণ — তারা যে টাকা ধার দিয়েছিল তার একটা বড় অংশ তারা ফেরত পায়নি। এই পরিমাণটা আঁতকে ওঠার মতো, প্রায় ১১লক্ষ কোটি টাকা। এবং এটা প্রধানত হয়েছে দেশের অর্থনীতির মাতব্বররা তাদের ধারের টাকা ফেরত দেয়নি বলে। এই বকেয়ার তালিকায় শীর্ষস্থানে আছে অনিল আম্বানি। প্রধানমন্ত্রীর অনুজতুল্য গৌতম আদানীর বকেয়ার পরিমাণও বিপুল। মার্কিনী পরামর্শদাতারা ম্যাকিনসে সরকারকে সাবধান করে যদি অবিলম্বে সরকার যথেষ্ট পরিমাণ মূলধন এই ব্যাঙ্কগুলোতে বিনিয়োগ না করে তবে দেশে গোটা ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাটা ভেঙ্গে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কাছেই জমা আছে দেশের ৭২% টাকা। সরকার নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু ‘আচ্ছে দিন’-র ঠেলায় সরকারেরও ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। এই টাকা সরকার দিতে পারেনি। নোট বাতিল করে মানুষের ওপর এই বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। আমার আপনার মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা, মায়ের চিকিৎসার জন্য সামান্য সংস্থান — এই সব নিয়ে আমরা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম, কারণ আম্বানি, আদানী বিজয় মালিয়ারা ফুর্তি করে টাকা উড়িয়েছে, ব্যাঙ্কের ধার শোধ করেনি। এদের কিছু হবে না কিন্তু আমার আপনার পকেট থেকে ১৪.৫০ লক্ষ কোটি টাকা সরকার তুলে নিয়ে চলে গেল এ ক’দিনে ব্যাঙ্ক বাঁচাতে। অথচ আমরা কোনো অপরাধ করিনি।

এটা গেল প্রাথমিক কারণ — কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য ‘নগদহীন অর্থনীতি’। দেশের বর্তমান অবস্থায় এটা অসম্ভব এটা কেবল আমি, আপনি জানি তাই নয়, নরেন্দ্র মোদীও জানেন। যে দেশের ৩৫কোটি মানুষের দৈনিক আয় ৪০টাকারও কম, যে দেশের সিংহভাগ গরিব মনুষ দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল সে দেশে নগদহীন অর্থনীতি আসতে শতাব্দী পার হয়ে যাবে। তাহলে? যেটুকু আছে তাই বা কম কিসের? National Council of Applied Economics Research (NCAER)-এর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ২৬.৭ কোটি আর দশ বছর পরে এই সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৪.৭ কোটি। মধ্যবিত্ত মানে যার যথেষ্ট ক্রয়ক্ষমতা আছে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সঞ্চয় আছে — এটি একটি বিশাল বাজার। সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার সমান। দেশের সবচেয়ে গরিব যে অংশ, প্রায় কাছাকাছি। দেশের অর্থনীতি যাদের ভূমিকা ন্যূনতম — তাদের গোল্লায় পাঠিয়েও যা পড়ে থাকে তাকে যদি নগদহীন ব্যবস্থার ছাঁচের সঙ্গে এনে ফেলা যায় তাহলেই হলো — দেশ লুণ্ঠনের সোনার খনি হয়ে যাবে। যত সঞ্চয় কমবে সেই অনুপাতে বাজার বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, মুনাফা বাড়বে। আমাদের দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ প্রায় নেই। কর্মসংস্থান বন্ধ। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এদের কিছু যায় আসে না, কিন্তু কর্পোরেটের মুনাফাতেও তো টান পড়বে। গরিব ছিলই, এখন এই মধ্যবিত্তের মাথায় নগদহীন কাঁঠালটি ভাঙলে বড়লোকদের ‘আচ্ছে দিন’ আসবেই আসবে।

এবং এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাটাও ধীরে ধীরে প্রাইভেট এবং বিদেশি ব্যাঙ্কের হাতে তুলে দেওয়া যাবে। ব্যাঙ্কের সাধারণ আমানত প্রধানত আসে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে। কিন্তু নগদহীন ব্যবস্থার গোটাটা ছুটবে ইলেকট্রনিক বিনিময়ের দিকে। যেমন আমাদের দেশে বর্তমানে কার্ডের মাধ্যমে যে লেনদেন হয় তার ৫৪% হয় প্রাইভেট ব্যাঙ্কের মাধ্যমে, ২২% হয় বিদেশি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে। আর বাকি ২৬% লেনদেনও পুরোপুরি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মাধ্যমে হয় না, অল্প হলেও কিছু সমবায় ব্যাঙ্কও দেশে কার্ড ব্যবসায় ঢুকেছে, তাদেরও একটা ভাগ থাকবে। Cash Less ব্যবস্থা আসলে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক — less ব্যবস্থায় পরিণত হবে। আম্বানি, আদানী, বিজয় মালিয়াদের একটু অসুবিধা হবে। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের টাকা তারা যেভাবে লুট করতে পারে প্রাইভেট ব্যাঙ্কের থেকে সেটা করা যাবে না। এতে দুঃখ করে কোনো লাভ নেই। পাকা আমের যতটা রস ছিল সব তারা খেয়েছে — এখন আঁটি নামক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ছুঁড়ে ফেলতে হবে। আর এস এস-প্রণীত দেশপ্রেমের গানে জয় ভারত, জয় মোদীর সাথে জয় ভিসা, জয় মাস্টারকার্ড এটাও যুক্ত হবে। আমরা সত্যি সত্যিই আধুনিক হব।


   সৌজন্যেঃ গণশক্তি

Well-planned Communal Battle Cry

December 24, 2015

গোরু থেকে পাথর, যা হচ্ছে সবই পরিকল্পিত

সাম্প্রদায়িক হিংসা লাফিয়ে বাড়ছে

বিশেষ প্রতিবেদক

লরি বোঝাই পাথর আসছে অযোধ্যায়। শিলাপূজা চলছে। রাম জনমভূমি ন্যাসের সভাপতি ঘোষণা করছেন, মোদী সরকারের ‘সিগন্যাল’ মিলেছে। মন্দির তৈরি করতে হবে এখনই।সাম্প্রদায়িক জিগির, হিংসা ছড়ানোর আরো এক তাস খেলা শুরু হলো। গত দেড় বছরে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোজ নতুন নতুন সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা সামনে আনছে আর এস এস-বি জে পি। নতুন ঠিক নয়, পুরনো, আর এস এসের চিরকালীন বিষয়গুলিই। বলা ভালো নতুন করে তুলে আনছে। গোটা দেশকে সেই অ্যাজেন্ডায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে

‘আচ্ছে দিন’-এর স্লোগানকে পিছনে ঠেলে জিনিসের দাম লাফিয়ে বাড়ছে, কৃষির সংকট, ফসল না-পাওয়া কৃষকের আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান ঘটনা, শ্রম আইন সংশোধন করে মেহনতির ন্যূনতম অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়ে কর্পোরেট পুঁজির লুটের রাস্তা অবাধ করার কাজ চলছে। রেগা, আই সি ডি এস, মহিলা সুরক্ষা সহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে ছাঁটাই চলছে নির্বিচারে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ ঘুরছেন, কোটি কোটি কর্মপ্রার্থীর কাজের সুযোগ তৈরির কোনো প্রচেষ্টা নেই।

এমন অবস্থায় আরো বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে বিভাজনের রাজনীতি। ধর্মীয় উন্মাদনার গোলকধাঁধায় ঢুকিয়ে দিতে হবে মানুষকে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে। রোজ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবারই লোকসভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে তথ্য দিয়েছেন তাতে বছরের প্রথম দশ মাসেই ৬৫০টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় ৮৪জনের মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বেও কারিকুরির অভিযোগ উঠছে।

মোদী-রাজে দেশে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির ঘটনায় দেশজোড়া প্রতিবাদের মধ্যেই গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে সরকার এই ধরনের ঘটনা কম করে দেখাচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী ২০১৪সালে দেশে ৬৪৪টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। অথচ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর হিসেব অনুযায়ী ২০১৪সালে দেশে ১২২৭টি সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় ২০০০জন জখম হয়েছেন। তাহলে কোনটি সঠিক? বিপদে পড়ে এখন একই মন্ত্রকের দুইরকম তথ্যের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

সংখ্যার হিসেবের কচকচানি ছেড়ে দিলেও খালি চোখেই যা দেখা যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট শুধু সাম্প্রদায়িক হানাহানি নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে সংঘ। খাদ্যাভ্যাস থেকে ধর্মাচরণ, প্রেম-বিবাহ, সঙ্গী নির্বাচনের মত একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও নিয়ন্তা হতে চাইছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। বিপদ সবথেকে বেশি সেখানেই।

উচ্চশিক্ষা, গবেষণার প্রতিষ্ঠানগুলির দখলদারি সম্পূর্ণ হয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেও একই অবস্থা। ইতিহাস বিকৃতির কাজ চলছে। শিশুমনেই সংঘের ইতিহাস গেঁথে দেওয়ার সরকারী উদ্যোগ শুরু হয়েছে। অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারের আবাদ হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কর্পোরেট মিডিয়াকে পকেটে পুরে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। যে কোনো পোস্ট মন মতো না হলেই শারীরিক আক্রমণ। শুরুতেই মুম্বাইয়ে খুন হয়ে গেছেন পেশাদার সফটওয়ার বিশেষজ্ঞ সাদিক শেখ।

একের পর এক যুক্তিবাদীরা খুন হচ্ছেন। অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। এতই অপদার্থ আমাদের পুলিশ, প্রশাসন? এতই নিষ্কর্মা গোয়েন্দা বিভাগ? নাকি এক্ষেত্রেও হিন্দু সন্ত্রাসবাদীদের মত ছাড় দেওয়ার খেলা চলছে, প্রশ্ন সেটাই। এই সরকার তো সন্ত্রাসবাদীও স্থির করছে ধর্ম দেখে।

গোরুর মাংসের গুজব ছড়িয়ে মহম্মদ আখলাককে খুন করা হচ্ছে। আবার উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাংসদরাই জোর করে মুখে খাবার গুঁজে দিচ্ছে রোজা রাখা সরকারি কর্মীকে। বই প্রকাশ আটকাতে কালি লেপা হচ্ছে তো আমির খানকে দেশ ছাড়তে বলা হচ্ছে। ক্রিকেট মাঠ থেকে দিলওয়ালে– আক্রমণ সর্বব্যাপী।

সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়াতে সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা বেপরোয়া, বেলাগাম। প্রধানমন্ত্রী নীরব, নিশ্চুপ। তবে চুপ থাকতে পারলেন না বেশি দিন। বিহার ভোটে ‘ময়ূর পুচ্ছ’ খুলে উলঙ্গ হয়েই ময়দানে নেমে পড়লেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী যে এভাবে সরাসরি সাম্প্রদায়িক জিগির ছড়াতে পারেন, সে ঘটনারও সাক্ষী হলো দেশ।

ধর্মান্তরকরণ, লাভ জিহাদ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, কাশ্মীর, ৩৭০ ধারা, গোরু, রাম মন্দির– উগ্র ধর্মীয় জিগির ছড়ানোর কাজ চলছে। যখন যেটা সামনে আনলে সুবিধে সেই মত কাজ চলছে। রাজ্যে রাজ্যে বিশেষ করে গরিব মানুষকে ভয় বা লোভ দেখিয়ে একদফা ধর্মান্তরকরণ চললো। ‘লাভ জিহাদের’ নামে তরুণ-তরুণীদের মেলামেশা, সঙ্গী নির্বাচনেও বাধা দিতে নেমে পড়লো সংঘ। দিল্লি সহ একাধিক রাজ্যে আক্রান্ত হলো খ্রিস্টানদের উপাসনা ঘর। আক্রান্ত হলেন যাজকরা

ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশের মত বি জে পি শাসিত রাজ্যের রেগার কাজ, রেশন দেওয়া বন্ধ করে আদিবাসী খ্রিস্টানদের জোর করে ধর্মান্তরকরণ করানো হলো। এরপর শুরু হলো গোরু। যাকে যেখানে খুশি ‘গো-মাতার’ নামে আক্রমণ করা যায়। খুন করা যায়। বিহার ভোটের মুখেও গোরু নিয়ে মরিয়া প্রচার চললো। এবার টার্গেট উত্তর প্রদেশ। ভোট ২০১৭সালে। শুরু হয়েছে রাম মন্দির নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর খেলা।

কোনোকিছুই বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত নয়। হঠাৎ করে কিছু ঘটে যাচ্ছে না। সারা দেশে সাম্প্রদায়িক জিগির ছড়ানোর যে কাজ চলছে তাকে শুধুই অসহিষ্ণুতা বলা চলে না। আর এস এস তার নিজস্ব অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী চলছে এবং তা চাপিয়ে দিচ্ছে জনগণের ওপর। মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে সেই অ্যাজেন্ডায়। সবটাই সুপরিকল্পিত, পূর্বনির্ধারিত

Fight For Rice, Meat; And Mamata

November 6, 2015

ভাতের লড়াই, মাংসের কাজিয়া এবং মমতা

চন্দন দাস

মিড ডে মিলে মাংস দেওয়া হয় না। ডিম দেওয়া হয়। সাধারণত একদিন।ডিম কার? কে দিয়েছে? এ’ নিয়ে কাজিয়া বাধানোর অবকাশ নেই। কারণ পাখির সঙ্গে দেশপ্রেমের সরাসরি সংযোগ সংক্রান্ত কোনও নিদান নেই।

আগামী দিনে মিড ডে মিলে আদৌ ভাত দেওয়া যাবে কিনা, শিশুরা আর পড়তে আসতে পারবে কিনা নিদারুণ আর্থিক সঙ্কট ডিঙিয়ে — এই প্রশ্ন ক্রমাগত সক্রিয় হয়ে উঠছে দেশে এবং রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে অনেক শিশু শিক্ষাকেন্দ্র, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সামনে। তবু ভাত নিয়ে, চাল নিয়ে, ‘ভাতের কারখানা’ নিয়ে মাথাব্যথা বিশেষ কারও নেই। ভাতের সঙ্গে কী দেশপ্রেম, নাগরিকত্বের কোনও সম্পর্ক নেই?

থাকার কথা। কে কত বড় দেশপ্রেমিক ঠিক করা উচিত, কে দেশের গরিবের জন্য কত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে তার উপর। কিন্তু তা হয়নি গত ৬৮ বছরে। দেশপ্রেমের ঠিকাদাররা এখন মাংসের মানদণ্ডে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর দেশপ্রেমের দিনমজুররা ভাতের লড়াইটা পৌঁছে দিচ্ছেন, দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন আজও। তা সে বর্ধমানে হোক, জঙ্গলমহলে হোক কিংবা চা বাগানে — ছবি একই। মাংসের কাজিয়া মূলত সেই ভাতের লড়াইকে ভুল দিকে ঘুরিয়ে দিতে।

দেশপ্রেমের দিনমজুর…

সাভারকারের সঙ্গে আমাদের লড়াই অনেকদিনের। ১৯২৫-এ আরএসএস-র জন্ম। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯২০-তে। সাভারকার ভারতে ‘হিন্দুত্ব’ ভাবনার স্থপতি। তিনি সেলুলার জেলে ছিলেন। গণেশ ঘোষও। সাভারকার জেল থেকে ব্রিটিশ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়েছিলেন। গণেশ ঘোষরা অবশ্য সেখান থেকেই, বিস্তর কষ্ট সহ্য করে কমিউনিস্ট হওয়ার রাস্তা তৈরি করেন। সাভারকারের ভাবশিষ্যরা এখন ঠিক করছে কে দেশপ্রেমিক, আর কে পাকিস্তানি। আর গণেশ ঘোষের উত্তরসূরিরা এখনও পদাতিক, দেশপ্রেমের দিনমজুর। রাষ্ট্র তাঁদের দেখে না। মোটা মাইনে দেয় না। কিন্তু দেশবাসীর ভাত, মোটা কাপড়, কাজ, এতটুকু ছাদের লড়াইটা এখনও, বিস্তর রক্তপাতের পরেও লড়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এ’ লড়াই বাঁচার লড়াই। এ’ লড়াই জিততে হবে — স্লোগানটা বস্তাপচা হয়নি। এখনও লাল পতাকা মানে এটাই।

সাক্ষী, প্রমাণ জঙ্গলমহলে। ২৩টি ব্লক। ২০০১-র ২৩শে জানুয়ারি থেকে ২০১১-র ৩০ শে নভেম্বর — সময়কাল মাত্র ১০ বছর ১০ মাস। মানে ১৩০ মাস। আর এই সময়ে জঙ্গলমহলে ২৭৫ জন শহীদ হয়েছেন। নির্দিষ্ট একটি এলাকায়। তাঁদের মধ্যে পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আছেন। আবার নেহাতই স্কুলছাত্র — তিনিও আছেন। অসমসাহসী মহিলা আছেন। সংখ্যালঘু আছেন। আদিবাসী তো আছেনই। সবচেয়ে বড় কথা — খেতমজুর আছেন অনেকে। গরিব কৃষক, ছোট ব্যবসায়ীও আছেন শহীদ তালিকায়।

তারপরও টিকে আছে পার্টি। সিপিআই(এম)। ‘টিকে থাকা’ শব্দটির মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব অনুরণিত হয়? তাই না। আসলে এতজন সংগঠককে হারিয়ে হাঁটু মুড়ে, দুমরে মুচড়ে পড়ে যাওয়ার কথা। কোথাও কোথাও মিশে যাওয়ার কথা লালমাটির সঙ্গে। লোধাশুলির অফিস বিস্ফোরণে উড়ে যেতে পারে। সে তো ইঁট, কাঠ, কংক্রিটের। কিন্তু জান আছে দেশপ্রেমের ধারণায়। দেশপ্রেম মানে মানুষ। তাই সিপিআই(এম)-র নেতা, কর্মী, সমর্থকদের গুলি ঝাঁঝরা করা মাওবাদী নেত্রী যখন তৃণমূল কংগ্রেস নেতার সুখী ঘরণীর জীবন কাটাচ্ছেন, তখনও, সেই ‘বিপ্লবী’দের ভয় জাগানো আঁকা বাঁকা মেঠো পথে প্রচার চালাচ্ছে সিপিআই(এম)।

জঙ্গলমহলে রেগার জবকার্ড আছে ৬লক্ষ ২৭ হাজার ৪০১টি পরিবারের। আর কাজ পেয়েছেন চলতি বছরে ৩৬ হাজার ৮০টি পরিবার। শতাংশের হিসাব করলে রাষ্ট্র, সরকারের লজ্জায় মাথা হেঁট হওয়া উচিত। নতুন ধানের দাম বস্তা(৬০ কেজি) ৫৫০ টাকা। নির্ধারিত দামের প্রায় অর্ধেক। আর ৩০ কেজি বীজধানের দাম ১২০০টাকা। প্রতিটি ব্লকে কিষান বাজারের প্রতিশ্রুতি ছিল। সব ব্লকে হয়নি। যে কটি ব্লকে হয়েছে, সেগুলির ভবনগুলি শুধু দাঁড়িয়ে আছে। কৃষক সেখানে যান না। সেখানে কোনও কেনাবেচার দেখা নেই। গোয়ালতোড়ে ১০০০ একর জমিতে শিল্পের ঘোষণা এখনও প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে রয়েছে। জঙ্গলমহলের জন্য পৃথক এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কের ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেটি হয়নি। ল্যাম্পস যা ছিল আদিবাসীদের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম, সেগুলি এখন ধুঁকছে। গ্রামগুলিতে কর্জ, দাদনে জর্জরিত কৃষক ক্রমাগত মহাজনের দেনা-চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে রেগার মজুরি চাই, কাজ কোথায়, শিল্পের কী হলো, কেন ফসলের দাম পাচ্ছি না, এত যে প্রতিশ্রুতি দিলে তার কী হলো — নানা দাবি ধূমায়িত। আবার সভা, মিছিল দেখা যাচ্ছে জোরালো। প্রতিটি ব্লকে জমায়েত হয়েছে এই সময়ে। পুলিশের সাধ্য কী তাকে আটকায়? ডেপুটেশন দিচ্ছেন গ্রামবাসীরা — সামনে পার্টির নেতা, কর্মীরা। সেই চেনা ঝান্ডা। শহীদদের পতাকা।

শিলদায় দেখা হলেই অনন্ত বলতো —‘‘শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবো।’’ কমরেড অনন্ত মুখার্জি নেই। তাতে কী? এই হেমন্তেও ‘অনন্তরা’ থেমে নেই।

দেশে এমন উদাহরণ আছে? না। বিদেশে? হাতে গোনা যাবে।

ভয়ও হেরে যায়, রাস্তা ছেড়ে দেয় নতজানু হয়ে — এমন পার্টি দেশে একটিই আছে। কবিতা মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে বান এসেছে হৃৎকমলের সুবর্ণরেখায়? মোটেও না।

আমি হাজারও ঋত্বিক দেখেছিলাম। হাজারও ঋত্বিক দেখছি। দেশপ্রেমের পদাতিক তো তাঁরাই। তাই ভরসা থাকুক তাঁদের উপর। নজর থাকুক সামনে। জোয়ার আসছে কাঁসাইয়ে।

অপেক্ষাকে যত্ন করুন।

মাংসের কাজিয়া, মুখ্যমন্ত্রীর নীরবতা..

চা বাগানে ঠিক মত খাওয়াই জুটছে না। অনাহারে মারা যাচ্ছেন বন্ধ বাগানের শ্রমিক পরিবার। জঙ্গলমহলে কাজ নেই। রেগার মজুরি জুটছে না রাজ্যের কোনও জেলায়। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূমে ধান পুড়ে খাক। অন্যত্র ধানের দাম নেই। আলুর দাম নেই। বাকি সব ফসলের একই হাল। ঠিক এখন, এই পশ্চিমবঙ্গে মাংসের চরিত্র নির্ধারণের সময় নেই বেশিরভাগের। দেশের অবস্থাও প্রায় এক। এ’ কথা ঠিক যে, দেশের অন্য কোনও রাজ্যেই এমন রাজ্য সরকার নেই। উৎসবের বিলাসিতায়, ঘোষণা-প্রতিশ্রুতির ভেলায় ভেসে চলা এমন রাজ্য প্রশাসন দেশে বেনজির। প্রতিবাদী আক্রান্ত হবেই, নির্ঘাৎ হবে — এমন নিশ্চয়তা দেশের প্রায় কোনও রাজ্যে নেই। চুরির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রীর ‘পাশে থাকার’ পোস্টার সাঁটিয়ে অবলীলায় স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ছুটে চলা অটো দেশের কোথাও মিলবে না। আর এখানেই রাজ্য সরকারের অগণতন্ত্র, ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজপথের লড়াইয়ে এত রক্তক্ষরণ, তীব্রতা সাম্প্রতিককালে দেশের আর কোথাও মেলেনি।

মোদীর হাতে দেশ বিপন্ন। মমতা ব্যানার্জির সরকারই বেসামাল।

কতটা বেসামাল তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার মুখ্যমন্ত্রী নিজে বুঝিয়ে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ সফরে। শিল্পপতিদের হাত জড়ো করে অনুনয়, বিনয় করেছেন বিনিয়োগের জন্য। অথচ ২০০৬-০৭-এ কী নিদারুণ ‘বীরত্ব’ আমরা দেখেছিলাম তাঁর মধ্যে। সিঙ্গুর সাক্ষী। কাটোয়া সাক্ষী। ভাঙড় সাক্ষী। সাক্ষী আরও অনেক জায়গা, যেখানে বামফ্রন্টের সরকার শিল্পের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন, নন্দীগ্রামের এক সভায় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী বলেছিলেন,‘‘ভাতের কারখানা ধ্বংস করে মোটর গাড়ির কারখানা/ সে হবে না, সে হবে না।’’ ‘কৃষক-দরদী’ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা সেই ছড়াকে নিজেদের উত্থানের রিং টোন করে ফেলেছিলেন।

এখন রাজ্যে বিনিয়োগের দেখা নেই। আর ‘ভাতের কারখানা’, অর্থাৎ খেতখামারের অবস্থা গত আটত্রিশ বছরের সবচেয়ে দুরবস্থার মুখোমুখি। একশোর বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ১৪১০ টাকা কুইন্টাল প্রতি হলেও, রাজ্যের কোথাও কুইন্টাল প্রতি ৯০০-৯৫০ টাকা ধানের দাম কৃষকরা পাচ্ছেন না। আসলে ভাতের কারখানা আর মোটর গাড়ির কারখানার একটি গভীর যোগাযোগ ছিল, যা মমতা ব্যানার্জি কিছুতেই রাজ্যের মানুষ বুঝে ফেলুন, তা চাননি। তাই কখনও মাওবাদী, কখনও আরএসএস, কখনও জামাতের সঙ্গে মিলে রাজ্য জুড়ে নৈরাজ্য তৈরি করেছিলেন।

বামফ্রন্ট সংবেদনশীল ছিল। অনেকে তাকে দুর্বলতা ভেবেছিল। আর সেই নৈরাজ্যের ফল এখন মিলছে। শিল্প গত। ভাতের কারখানাও পতিত হতে বসেছে। এমন সময়ে মাংসের কাজিয়া নিয়ে মমতা ব্যানার্জি কী করে কঠোর সমালোচনা করেন? দেশের নানা পর্যায়ের মানুষ প্রতিবাদ করছেন। বামপন্থীরা তো হিন্দুত্ববাদীদের পয়লা নম্বর দুশমন। তাঁরা তো প্রতিবাদে সোচ্চার হবেনই। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি বিলকুল চুপ। এই নীরবতা সন্দেহজনক। কিন্তু একেবারে বোঝা যাচ্ছে না নীরবতার কারণ, তা নয়। ‘মাংসের কারবারিরা’ই তাঁকে আবার রক্ষা করতে পারে, সেই অঙ্ক করে ফেলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর অনেক দিনের পুরোন বন্ধুরা আছেন এই মাংসের পরিচয়পত্র তৈরির কাজে।

বাঁটোয়ারাপন্থীরা বাড়ছে…

মাংস কার? গোরুর না মোষের? নাকি পাঁঠার? নাকি মুরগি, হাঁসের মাংস খাওয়া উচিত? বিতর্কের বল গড়াতে গড়াতে শেষ পর্যন্ত ‘দেশপ্রেমে’ পৌঁছে গেছে। কে পাকিস্তানি, কে ভারতীয় — ঠিক করছে মমতা ব্যানার্জির ‘দেশপ্রেমিকরা’। অর্থাৎ আরএসএস, সঙ্ঘ পরিবার। ২০০৩-র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে আরএসএস-র সভায় হাজির হয়ে আজকের বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন,‘‘আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমরা জানি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন।’’ সেই আরএসএস ‘দেশপ্রেমের’ শংসাপত্র দিচ্ছে। কার কার পাকিস্তানে যাওয়া উচিত, তাও ঠিক করে দিচ্ছে। এদের কাছে মমতা ব্যানার্জি কমিউনিস্টদের সরানোর জন্য সহায়তা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন,‘‘যদি আপনারা(আরএসএস) ১শতাংশও সহায়তা করেন আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।’’ আরএসএস সেদিন তাঁকে ‘সাক্ষাৎ দূর্গা’ বলে অভিহিত করেছিল।

সেই আরএসএস-র ‘মাংস বিতর্ক’ এবং দেশপ্রেমের অপপ্রচার মমতা ব্যানার্জিকে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সহায়তা করবে, এমনটাই তৃণমূল কংগ্রেসের অভিজ্ঞ নেতারাও মনে করছেন। রাজ্যে আরএসএস বেড়েছে গত চারবছরে। গত চার বছরে তাঁদের শাখার সংখ্যা ৫৮০ থেকে হয়েছে ১৪৯০। বৃদ্ধি ১৫৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-র এমন বিকাশ কখনও হয়নি। রাজ্যে আরএসএস ‘অনুপ্রবেশ’ সমস্যাকেই প্রধান বিপদ বলে প্রচার শুরু করেছে। আর খোদ মমতা ব্যানার্জিই সংসদে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুতে সঙ্ঘ পরিবারের বক্তব্য তৃণমূলের সাংসদ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন।

দিনটি ছিল ২০০৫-র ৪ঠা আগস্ট। লোকসভায় অধ্যক্ষের মুখের উপরে কাগজের তাড়া ছুঁড়ে দিয়ে অভব্যতার এক নজির সৃষ্টি করেছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী। পুরো সংসদ বিস্মিত হয়েছিল তাঁর এই কাণ্ডে। কেন সেদিন তিনি এমন করেছিলেন? কারণ, সেদিন তিনি সংসদে ‘অনুপ্রবেশ সমস্যা’ নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। বামফ্রন্ট সরকার কিভাবে অনুপ্রবেশে মদত দিচ্ছে, তার গল্প শোনাতে চেয়েছিলেন। অনুমতি মেলেনি। তাই ওই অভব্যতা। অর্থাৎ, রাজ্যে যখন শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলনের অবস্থানের কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি পা রাখার সামান্য জায়গা পাচ্ছে না, তখন ‘পশ্চিমবঙ্গের অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সংসদে বলে সঙ্ঘ পরিবারের কাছে বার্তা দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি — ‘আমি তোমাদেরই লোক’।

গত চারবছরে রাজ্যে মৌলবাদীরাও বেড়েছে আরএসএস-র মত। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে এই মৌলবাদীদের সমর্থকরা কখনও মাথা তুলতে পারেনি। মমতা ব্যানার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য এই প্রবল স্বাধীন বাংলাদেশ বিরোধী, ধর্মান্ধ, উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী অংশের একটি সহযোগিতা ছিল। সম্প্রতি সারদার টাকা সেই উগ্রপন্থীদের হাতে পৌঁছোনর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাতে আবার মুক্তিযুদ্ধের সময়, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসা হাসান আহমেদ ইমরানের নাম জড়িয়েছে। তিনি রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী সিমি-র প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ২০০৭-’০৮ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে আশ্রয় নেন। তসলিমা নাসরিনের ভিসার বিষয় নিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে এক উত্তেজনা, ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন ইদ্রিশ আলি। তাকেও মমতা ব্যানার্জি সাংসদ করেছেন। ফলে গত সাড়ে তিন বছরে রাজ্যে কট্টর মৌলবাদী একাংশ সরকার এবং শাসক দলের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। যা আসলে পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যের পক্ষে ঘোর লজ্জার। তবু তাই হয়েছে।

দুই সাম্প্রদায়িক শক্তিই এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বেড়েছে। বেড়েছে সরকারের ব্যর্থতা, আর্থিক মন্দাকে ভিত্তি করে। এমন পরিস্থিতিতে সামনে বিধানসভা নির্বাচন। কাজের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলন অনুঘটক হতে চলেছে সেখানে। ভাতের দাবিতে গর্জে ওঠা লড়াই হয়ে উঠতে চলেছে নিয়ন্ত্রক। আর ঠিক এখনই, মাংসের কাজিয়া, দেশপ্রেমের প্রচার জরুরি মমতা ব্যানার্জিরও। বিজেপি, আরএসএস সেই কাজই করছে।

তাই নীরবতা মুখ্যমন্ত্রীর। কোনও সন্দেহ নেই।

Religious Fundamentalism & Fight Of The Left

October 30, 2015

ধর্মীয় মৌলবাদ ও বামপন্থীদের লড়াই

কৃষ্ণেন্দু রায়চৌধুরি

মরশুম উৎসবের, কিন্তু বেনজির ন্যক্কারজনক আক্রমণ তাল কেটেছে উৎসবমুখী মানুষের মেজাজে। সাম্প্রদায়িক শক্তির মাত্রাতিরিক্ত তৎপরতা এবং একই সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন দেশের সরকার। রাষ্ট্রের প্ররোচনা, উদাসীনতায় যে ন্যক্কারজনক ঘটনাগুলি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলেছে অবিরত, তাতে ধ্বংস হচ্ছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো। গোবিন্দ পানসারে, নরেন্দ্র দাভোলকর, এম এম কালুবর্গীকে হত্যা, দাদরিতে প্ররোচনা ছড়িয়ে নৃশংসভাবে খুন, এমনকি শিল্প সংস্কৃতি জগৎও এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণধর্মী আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পাকিস্তানের প্রাক্তন বিদেশ সচিবের বই প্রকাশ অনুষ্ঠান, জম্মু-কাশ্মীরের বিধায়কের প্রেস কনফারেন্স কিংবা ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট সিরিজ উপলক্ষে দু’দেশের বোর্ডের সভা আক্রান্ত ধর্মীয় মৌলবাদীদের দ্বারা।

দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সব ধরনের মৌলবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতে ও দে‍‌শের মানুষের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনকে দৃঢ় করার জন্য সমাজের সব অংশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস নেওয়া বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের অগণিত মানুষ, যারা শান্তি চান, ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্যকে অটুট রাখতে চান — মানুষের সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতিবাদে প্রতিরোধে গর্জে ওঠার সময় এখন। রাজ্যের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি পাঠিয়ে বলেছেন, ‘সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে হত্যা ও অসহিষ্ণুতার যে আবহ তৈরি হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সন্ত্রস্ত এবং অসহায় বোধ করছি। ক্রমাগত অবাধে আঘাত হানা হচ্ছে আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, নিরপরাধ সাধারণ নাগরিকের হত্যায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক সমাজ স্তব্ধবাক। সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ক্ষমার অযোগ্য

প্রশাসনিক অকর্মণ্যতা নাগরিকের মানবিক অধিকার খণ্ডিত করছে। স্বাধীন চিন্তার শ্বাসরোধের এই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে। দেশের ‘লৌহপুরুষ’ প্রধানমন্ত্রীর মুখে কোন কথা নেই। দাদরি হত্যাকাণ্ড, যুক্তিবাদী লেখকদের উপর আক্রমণ, দেশের নানা প্রান্তে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক প্ররোচনার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ জোরালো হচ্ছে। দেশের বিশিষ্ট লেখক, বুদ্ধিজীবীরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পুরস্কার ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন বিরোধীদের উপর– এটা আমাদের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক প্রহেলিকাদগ্ধ দিক ছাড়া আর কিছু নয়। আর এটাই এখনকার ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রকটিত সমাজনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দৈত্যদর্পী সমস্যা : ধর্মনিরপেক্ষতার সংকট– মানবিক ধর্মসত্তার বিপর্যয়। Ralph Fox যাকে বলেছেন: ‘Anarchy of capitalism in the human spirit’ — তৃণমূলে বুর্জোয়া সংস্কৃতির অরাজকতা কিংবা ‘Cultural terrorism of the ruling class’।

আমরা অধিকাংশই কম-বেশি Sick Society-র Sick product হয়ে পড়েছি। এর ফলে ভারতবর্ষের সমাজ-সভ্যতার অনুপম মুখশ্রী সাম্প্রদায়িক সমস্যার বিষগর্তে পাক খেতে খেতে রক্তাক্ত-ক্লিন্ন-ক্লেদাক্ত হয়ে যাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদের তীব্র কশাঘাতে রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি Humanity বা মানবিকতা ভুলে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেপ্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে ধর্মীয় মৌলবাদ ও গৈরিক ফ্যাসিবাদ উৎসাহিত হচ্ছে। Marx-Engels এর মতে, ‘…In reality and for the practical materialist, i.e, the communist, it is a question of revolutionizing the existing world, of practically attacking and changing existing things’.

(২)

সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে উদ্ভূত অনেকগুলি চরম প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্য বিশেষ জোরদার হয়ে উঠেছে। যেমন সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সযত্ন লালিত ঘৃণা, উচ্চবর্ণভিত্তিক পুরুষ আধিপত্যের মানসিকতা, সমাজের সাধারণভাবে দুর্বলতর অংশগুলির উপর এবং বিশেষভাবে গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ, যুদ্ধোন্মাদনা ও রাজনীতির সামরিকীকরণ, দুর্নীতি ও রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, মুখে স্বাদেশিকতার বুলি আউড়ে কার্যত সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন, ইত্যাদি।

এই প্রায় সবগুলি প্রতিক্রিয়াশীল বৈশিষ্ট্যের সমাহার হিসেবে যে পতাকাটি আজ আমাদের দেশে আন্দোলিত হচ্ছে তার রঙ ‘গৈরিক’। হিন্দুত্বের জয়ধ্বনি তুলে এই পতাকাটির দণ্ড ধারণ করে আছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (RSS) ও তার শাখা সংগঠনগুলি। হিন্দুত্বের এই যন্ত্রটি ‘৪৭-পরবর্তী’ ভারতে আগে কোনদিন আজকের মতো প্রাসঙ্গিক ও ভয়াবহ তাৎপর্যসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারেনি।

১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা হিন্দুত্বের এই আগ্রাসী অভিযানের প্রথম পর্বের বিজয় সূচিত করেছিল। কেননা, ওই ধ্বংসকাণ্ডটি কতিপয় দুবৃর্ত্তের দুষ্কর্মমাত্র ছিল না, বরং তার পেছনে ছিল সেই হিন্দুত্বের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস, যার প্রতিটি অধ্যায়ে খোদিত ছিল আগ্রাসী সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা, বহুত্ববাদী ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির অস্বীকৃতি, অন্য সম্প্রদায়ের, এমনকি ব্যাপক হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘দলিত’ অংশের প্রতি ঘৃণা ও হিংসা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য ও আচার আচরণের প্রতি তীব্র অনীহা।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও তার প্রবক্তাদের প্রকৃতপক্ষে দুটি রূপ — একটি প্রকৃত মুখ, আরেকটি মুখোশ। তারা কথা বলে সম্পূর্ণ দুই পৃথক ভাষায়, কাজ করে দুই বিপরীত পদ্ধতিতে। সেই ভাষা গণতন্ত্রের, কর্মপদ্ধতি স্বৈরতন্ত্রের। একদিকে ঐকমত্যের, অন্যদিকে বলপ্রয়োগের। হিন্দুত্বের রাজনীতির ধারক ও বাহক এই সংঘ পরিবারের মূল কেন্দ্রে রয়েছে RSS ও তার রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। অন্যদিকে RSS নিজে এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল প্রভৃতি জানা-অজানা অসংখ্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এই কাঠামোটিকেই যেনতেন প্রকারেণ ধ্বংস করতে চায়।

সংঘ পরিবারের এই একইসঙ্গে পরিপূরক ও পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন অঙ্গের জটিল টানাপোড়েনের স্বাভাবিক পরিণতি ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা। একইসঙ্গে তা উদ্‌ঘাটিত করে দিয়েছিল বি জে পি-র সযত্ন-সৃষ্ট তথাকথিত গণতান্ত্রিক বাতাবরণের অন্তঃসারশূন্যতার এবং তার অন্তরালবর্তী চরম হিংস্রতার প্রকৃত স্বরূপ। হিন্দুত্বের এই হিংস্র অভিযানের অন্তর্নিহিত দর্শনের প্রণেতা ও ভাষ্যকার স্বাভাবিকভাবেই তার মস্তিষ্ক অর্থাৎ RSS। অবশ্যই তাদের দাবি- আর এস এস রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। হিন্দুদের সংস্কৃতির সংস্কারের মাধ্যমে নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হিন্দু-আত্মপরিচয়ের জন্ম দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

এই তথাকথিত সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আসলে গভীরভাবে রাজনৈতিক। এই কর্মসূচির অন্তর্নিহিত আগ্রাসী ও প্রাতিষ্ঠানিকতামুখী হিন্দুত্বের রাজনীতির করাল ছায়া সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ প্রসারিত। সাঁড়াশির মতো তা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে। আমাদের বাস্তব জীবনকে, আমাদের অস্তিত্বকে, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সংবাদমাধ্যম, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, সামরিক বাহিনী প্রভৃতি রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্র-বহির্ভূত সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘটছে তার অনুপ্রবেশ। চলছে তার সার্বিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা।

প্রথমে তেরোদিন, তারপর তেরো মাস, পাঁচ বছর হয়ে এবার একক ক্ষমতায় পরবর্তী পাঁচ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের সুযোগ তার এই করাল বন্ধনকে আরো বেশি আগ্রাসী ও ভয়াবহ করে তুলেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ও মূল্যবোধে এবং সরকারি, বেসরকারি সংগঠনে তার প্রভাব ধরা পড়েছে। হিন্দুত্বের মন্ত্র আওড়ানো এই ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের আগ্রাসী অভিযান অবাধে চলতে থাকলে তার সম্ভাব্য পরিণতি কী বীভৎস ও ভয়ঙ্কর হতে পারে সেকথা চিন্তা করে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন যে-কোনো মানুষই শিউরে উঠছেন। শহীদ বিরসার হাত ধরে যে শতাব্দীর সূচনা, যে শতক দেখেছে অগ্নিযুগের আত্মদান, ভারত-ছাড়ো আন্দোলন আর নৌ-বিদ্রোহ, সাক্ষী থেকেছে শোলাপুর-তেভাগা-তেলেঙ্গানা-সাঁওতাল এবং আরও কত মহান গণজাগরণের। তার অন্তিমে আজ ভারতভাগ্যবিধাতার আসনে অধিষ্ঠিত গেরুয়াধারী বকধার্মিকরা।

ভারতীয় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফ্যাসিবাদ এখনো জাঁকিয়ে বসতে পারেনি — বি জে পি-কে এখন গৈরিক রঙ-এর পেছনে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চালাতে হচ্ছে। যে দেশে পুঁজিবাদ দূরের কথা, সামন্ততন্ত্রও ইউরোপীয় ধরনে ও মাত্রায় বিকশিত হয়নি, সেখানে ফ্যাসিবাদের শ্রেণী-ভিত অতী‍‌তের ইতালি বা জার্মানির মতো হতে পারে। বি জে পি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সুবাদে হাতে নিয়েছে মৌলিক কিছু কাজ। যেমন, ফ্যাসিস্ত দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের ইতিহাস পালটে লেখা, সংবিধান সংশোধন, শিক্ষা-সংস্কৃতির গৈরিকীকরণ ও হিন্দু মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষকতা। দেশে এখন একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়, কথাটা হলো ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। দেশের জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার যে সরকার, সেই সরকারের প্রধান শরিক হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। বর্তমান যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি এই দলের প্রধান নেতা। প্রসঙ্গটা হলো বি জে পি ধর্মের নামে, গেরুয়া রঙের আড়ালে ফ্যাসিবাদ কায়েম করার চেষ্টা করছে। বি জে পি-র অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা ‘হিন্দুত্ববাদ’কে বাস্তবায়িত করা।

(৩)

নরেন্দ্র মোদীর শাসনের এক বছর পর এটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে ধর্মীয় মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদ দি‍য়ে বলীয়ান হয়ে তাঁরা চান দেশের মানুষের উপর সীমাহীন শোষণ নামিয়ে এনে ধনীদের আরও ধনী করতে, পুঁ‍‌জির মালিকদের বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতে, সর্বোপরি আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত নয়া উদারনীতির রথযাত্রার পথ মসৃণ করতে। সহজ করে বলা যায়– আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌলবাদের মূল ধারা হলো ধর্ম নিয়ে ধুয়ো তুলে নিজেদের শাসন ক্ষমতার পথ সুগম করা ও তার মাধ্যমে এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির লুটের ক্ষেত্র করে তোলার পথ আরও প্রশস্ত করা। এর জন্য সংখ্যালঘু-জুজু তৈরি করে ক্ষমতা দখল এবং এদেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির মৃগয়াক্ষেত্র বানানো। এর জন্য প্রয়োজন ইতিহাস-বিকৃতি, প্রগতিশীল লেখক, দরিদ্র মানুষ, নিরপরাধ শিশু এমনকি মুসলিম বুদ্ধিজীবী বিধায়কদের আক্রমণ, হত্যা। এদের আসল শত্রু হলো- শ্রেণী রাজনীতি, বামপন্থা, মার্কসবাদ

নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের নেতৃত্বে মেহনতি মানুষ বিক্ষোভরত। ধর্মের নামে তাদের ভাগ করে এই আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। বামপন্থীরা মেহনতি মানুষকে জোটবদ্ধ করে। বামপন্থা হলো ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার একটা জোরালো মতাদর্শ। সেই মতাদর্শ সমাজে প্রোথিত করতে পারলে সমাজে মৌলবাদীরা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই মেহনতি মানুষের সংগ্রাম বন্ধ করতে, বামপন্থী গণ-আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে চারদিক থেকে আক্রমণ চলছে। ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় মৌলবাদ হলো একটি রাজনৈতিক তাস। বি জে পি-র পক্ষে হিন্দু মৌলবাদী তাস ছাড়া অন্য কোন তাস খেলা সম্ভব নয়।

নীতিগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে একমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণী, কেননা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করার উপায়ই হলো ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া। শ্রমজীবী শ্রেণীর দল সেই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ। মৌলবাদ, গৈরিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংহত করতে হলে বুর্জোয়া শ্রেণী ও তার দলের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামতে হবে এবং সেটা কেবলমাত্র শ্রমজীবী শ্রেণীর দলগুলির পক্ষেই সম্ভব। শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সামনে উঠে আসবে যেসব গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক শক্তি, তারা হাত মেলাবে বামপন্থীদের সঙ্গে। তাদের নিয়ে একেবারে নিম্নস্তর থেকে গড়ে উঠবে মৌলবাদ-ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চ।

সাম্প্রদায়িকতা, উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ-সহ বি জে পি সরকারের জনবিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বামপন্থীরা। জনগণের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম, দেশের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার সংগ্রাম অব্যাহত গতিতে আরও প্রসারিত, আরও শক্তিশালী করে তোলাই বর্তমান সময়ে বামপন্থীদের মূল কর্তব্য। নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী-দেশবিরোধী কাজের বিরোধিতাই শুধু নয়, সমগ্রভাবে শাসকশ্রেণির ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতিস্পর্ধী হোক বামপন্থা।

Dadri Lynching: A Challenge To Cultural Diversity

October 18, 2015

দাদরি : বহুত্ববাদের সামনে চ্যালেঞ্জ

মইনুল হাসান

দাদরির ঘটনা দেশবাসীর জানা হয়ে গেছে। দাদরি পরবর্তী সময়টুকু আমাদের আলোচনার জন্য বরাদ্দ করেছি। তবে একবারও ভুলে যায়নি আখলাকের বাড়ির বারান্দায় যখন তার নিথর দেহটি পড়েছিল তখন তার কিশোরী কন্যা সাজিদা কি বলেছিল। ‘‘মাত্র কয়েকদিন আগে ঈদ হলো। বাড়িতে বিরিয়ানি হয়েছিল অনেক। খুশবু বের হচ্ছিল দারুণ। পাড়াপ্রতিবেশী বন্ধুরা খেয়ে গেল প্রতিবারের মতো। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই অমুসলমান। ৪ দিন বাদে তাদেরই কেউ কেউ আমাদের বাড়ি চড়াও হয়ে বাবাকে মিথ্যা কারণে খুন করলো। আমি নিশ্চিত, তাদের অনেকের হাত থেকে তখনও ঈদের দিনের বিরিয়ানির খুশবু শুকিয়ে যায়নি।’’ এই কথার কোনো উত্তর ভূ-ভারতে কারও কাছে আছে? বাচ্চা মেয়েটি ঠিকই তো বলেছে, মাংসটা গবেষণাগারে নিয়ে গেছে কিসের মাংস জানার জন্য। কি লাভ! আখলাক কি ফিরে আসবে? গবেষণাগার অবশ্য আখলাকের দাবি-র সপক্ষে প্রমাণ দিয়েছে।

(২)

দেশের ঐক্য, সহনশীলতা, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সামনে এটা একটি নেতিবাচক ঘটনা তাতে কারো সংশয় থাকার কথা নয়। কিন্তু পরবর্তী সময়কালে সরকারের নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ বা বিধায়করা যা করে চলেছেন তাতে আতঙ্কিত হবার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশিষ্ট মন্ত্রী অরুণ জেটলি বললেন, ‘আখলাকের হত্যার মতো ঘটনায় ভারতের নাম ডুবছে এবং বদনাম হচ্ছে। এমন হওয়া উচিত নয়’। এমনভাবে কথাটি বলা হলো যে, ভারতের নাম ডুবে যাওয়া ছাড়া একজন নিরপরাধ বয়স্ক মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ব্যাপারটিতে আর কোনো চিন্তার বিষয় নেই। সাংসদ তরুণ বিজয় যা বলেছেন তাতে আমি স্তম্ভিত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস অনেকেরই আমার মতো অবস্থা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনো প্রমাণ ছাড়া কেবলমাত্র সন্দেহ করে এমন ঘটনা নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক’। তাহলে যুক্তি এটাই যে, প্রমাণ থাকলেই এমনভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলতে কোনো অসুবিধা নেই।

এলাকার সাংসদ এবং দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রথম থেকেই বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, ভুল বোঝাবুঝি’র ফল ইত্যাদি বলে কাটিয়ে দিতে চেয়েছেন। সর্বশেষ বলেছেন যদি আখলাকের বাড়িতে হামলা হয় তাহলে তার কিশোরী কন্যা অক্ষত থাকলো কি করে? মন্ত্রী মহোদয়ের অনুশোচনা এটাই যে পূর্বপরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও কন্যাটিকে জল্লাদরা অক্ষত রাখলো কেন? আর আখলাকের মৃত্যুটি মায়া ছাড়া কিছুই নয়। আসলে দি‍ল্লির সরকারি মহলে তড়িঘড়ি পড়ে গেছে কে সবচাইতে আগে এবং সবচাইতে ঘৃণ্য ভাষায় এবং কাজে দেশের সহনশীলতা ও ধৈর্যের উপর আঘাত করতে পারে। এমন অশ্লীল পরিস্থিতি ভারতবর্ষ আগে কোনোদিন দেখেনি।

এরপর মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায়। লানগেট থেকে নির্বাচিত একজন বিধায়ক ইঞ্জিনিয়ার শেখ রশিদ বিধায়ক আবাসের লনে ‘বিফ ফেস্ট’-এর আয়োজন করেন। সবাই জানেন গোরুর মাংস নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এই রাজ্যে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। উচ্চ আদালত সব দিক বিচার করে নিষিদ্ধ করার যে নির্দেশ নিম্ন আদালত দিয়েছিল তাকে ২ মাসের জন্য স্থগিত করে দিয়েছে। শেখ রশিদের আমন্ত্রণে অনেকেই এসেছিলেন সেই উৎসবে। পরের দিন তিনি যখন বিধানসভা কক্ষে ঢুকছেন তখন বি জে পি বিধায়করা তার উপর চড়াও হয় এবং নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। বিধানসভার রক্ষী বাহিনী না থাকলে দেশ আর একজন ‘আখলাক’ সেদিনই পেয়ে যেত।

বি জে পি’র টি‍‌কিটে অনেকেই সাংসদ হয়েছেন যারা যোগী অথবা সাধু। সাধারণত অহিংসা তাদের অন্যতম অস্ত্র। হঠাৎ তারা এমন হিংস্র হয়ে উঠেছেন যা কল্পনারহিত। সাক্ষী মহারাজ বলছেন, ‘গো-মাতা রক্ষার জন্য তিনি খুন করবেন, অথবা খুন হবেন।’ যোগী আদিত্যনাথের তো কথাই নেই। এমন অশ্লীল ভাষা যোগীজী(!) ব্যবহার করেন যা লেখা যায় না। শোনার আগেই কানে আঙুল দিতে হয়।

(৩)

এতসব ঘটনার মধ্যে একটি রুপালি রেখা দেখা গেছে ১নং রাইসিনা হিলে। ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি’র উপরেই লেখা বই প্রকাশের অনুষ্ঠান। সেখানেই রাষ্ট্রপতি বললেন, বহুত্ববাদ এবং সহনশীলতা ভারত রাষ্ট্রের মর্মবস্তু। বললেন, দেশের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে রক্ষা করতে পারলেই দেশ এগিয়ে যাবে। জর্ডনের একটি সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে রাষ্ট্রপতি সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষা করার কথা বলেছেন। এই হট্টমেলার ঋতুতে সেটা ভারতবাসীর কম পাওনা নয়। এরই সূত্র ধরে আমাদের আবার ফিরতে হবে কতকগুলো পুরানো কিন্তু সতত সজীব ‘ডিসকাসে’। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তির অধিকার কি? আমি একজন সাধারণ ভারতবাসী। কারও প্রতি কোনোরকম হিংসা বিদ্বেষ না ঘটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো বাস করতে পারবো কিনা? আমার নিজের মতো বাঁচার এবং চলবার অধিকার থাকবে কিনা? আখলাকের ঘটনাতে এই প্রশ্নগুলিই আবার বেশি বেশি করে সামনে এসে গেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অথবা ধর্মীয় আচরণের আগে বিবেচ্য হতে হবে ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার। আমার রান্নাঘরে দারোগাগিরি করার অধিকার কারও নেই! এই মৌলিক কথাটিতে রাজ্য-কেন্দ্র অথবা যে কোনো রাজনৈতিক দল সকলকে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এই নিশ্চয়তা প্রথম দিতে হবে রাষ্ট্রের প্রধানকে। প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রথমে বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত ছিলেন। সেখান থেকেই জল মাপতে শুরু করেছেন। কারণ বিহারে ভোট আছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মাসে পালা করে পুরানো আমন্ত্রণপত্র খুঁজে বিদেশ ভ্রমণের কর্মসূচি ঠিক করা এখন দিল্লির অলিন্দে হাসি-মশকরার ব্যাপার হয়েছে। তাতেও কোনো বিনিয়োগ নেই। সরকারি খরচে বিদেশে ‍‌হিন্দু মহাসভা বা আর এস এস-র সভা করছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে অযৌক্তিকভাবে মুখ খুলছেন। আর নাটকীয় ভঙ্গিতে জানতে চাইছেন ‘বলুন, আমি সবার চাইতে বেশি কাজ করছি কিনা?’ সবাই হাততালি দিচ্ছে। এটাতেই প্রধানমন্ত্রীর আনন্দ। এসব না করে দেশে তার নন্দীভৃঙ্গীরা যে কাণ্ড করে বেড়াচ্ছে তা যদি সামলাতেন তাহলে আখলাক বেচারাকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হতো না।

দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করার শপথ গ্রহণ করার পর মন্ত্রীরা কার্যভার নেন। কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দেশের মূল সূত্র বহুত্ববাদকে নষ্ট করবেন না – প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তাদের দ্বারাই দেশের এমনতর মূল্যবোধগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আক্রান্ত হচ্ছে। সেটা জম্মু-কাশ্মীর প্রসঙ্গেই হোক, ধর্মান্তরকরণই হোক, গির্জার উপর আক্রমণই হোক। কেউই রাষ্ট্রের প্রধান দ্বারা নিরস্ত্র অথবা সমালোচিত হচ্ছেন না। সামগ্রিক সমস্যার মূল কেন্দ্রটি এখানেই নিমজ্জিত। দাদরির ঘটনাতে গোমাংস খাবার নৈতিকতা, প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, কারা কারা এই মাংস খেতেন তারই পক্ষে বিপক্ষে তুমুল বিতর্কে অনেকেই লিপ্ত। সেটাই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণেই হয়তো ‘বিফ ফেস্ট’ আয়োজিত হচ্ছে, কলেজের মধ্যে গোমাংস ভক্ষণ করে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছে। দু’দিন পরেই এই হুজুগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আখলাকের নামটাও কেউ সহজে মনে আনতে পারবে না। বিষণ্ণতায় ডুবে যাবে তার সংসারটি। রেখে যাওয়া ৭০ বছরের মা প্রতিদিন সন্ধ্যায় মগরবের নমাজের শেষে ছেলের নামে দোয়া করতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে।

কিন্তু যে প্রশ্নগুলো আখলাকের মৃত্যু আমাদের সামনে এনে দিয়েছে তারই জন্য বিতর্ক জরুরি। সমাধানের দাবি আরও দৃঢ় করাটা যুক্তিসঙ্গত। এই নারকীয় ঘটনা যে আইন সমর্থন করে না সেটা জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সমগ্র বিষয়টি আইনশৃঙ্খলার দিক দিয়ে কড়াভাবে দেখতে হবে। এই কাজে যুক্ত যারা তাদের কঠিন শাস্তিদান অত্যন্ত জরুরি। সবকিছু অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করাটা বিলম্ব করা মানে দেশের আইনকে অবমাননা করা। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যে প্রশাসন এবং বি জে পি যে ভূমিকা পালন করেছে সেটা ন্যক্কারজনক এবং হৃদয় কেঁপে ওঠার মতো। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা বেশিরভাগই নাবালক। আর বি জে পি, যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের যে কোনো উপায়ে ছা‍‌ড়িয়ে আনার চেষ্টায় ব্রত। ভারতবর্ষ একটা গণতান্ত্রিক দেশ, বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে তার একটা স্থায়ী আসন থাকতে হবে, এ দাবি বহু দিনের এবং ন্যায্যদাবি। কিন্তু উলটোদিকের প্রশ্নটিকে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। নিজের দেশের মাটিতে একটুখানি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবার ক্ষমতা কেন ভারতের নেই। দিনকে দিন ভারত যে এই অন্ধকার ও মূঢ়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে সেটাকে অস্বীকার করবে কি করে?

(৪)

এতগুলো কথা হয়তো বলার প্রয়োজন হতো না যদি দেশটা পঞ্চদশ শতাব্দীতে থাকতো। দেশটা একবিংশ শতাব্দীতে আছে আর বিশ্বজুড়ে প্রধানমন্ত্রী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়ার’ কড়া ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন তখন ‘পুতিগন্ধময়’ বিষয়গুলোতে নজর না দিয়ে উপায় নেই। কারণ, আর যাই হোক, যখন প্রচারের চকচকে রাংতাটি সরিয়ে ফেললে গো-ময় ভারত তার যাবতীয় দুর্গন্ধ নিয়ে হাজির হবে তখন ডিজিটাল ইন্ডিয়ার নাগাল পাওয়া মুশকিল বলেই আমার মনে হয়। যে আধুনিক ভারতের স্বপ্ন আমরা দেখি তার সঙ্গে বাস্তবের তফাৎটি বিশ্রী রকমের বিশাল তা মনে না রেখে উপায় নেই। কেবল মনে রাখছেন না প্রধানমন্ত্রী। আধুনিকতার নাম করে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে হিংসার বাস পাকাপাকিভাবে হতে যাচ্ছে, ক্লীবতার ঘরবাড়ি পোক্ত হয়ে উঠছে, প্রধানমন্ত্রী সেটা দেখেও দেখছেন না। অবলীলাক্রমে এসব কিছুকে নগ্নভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন।

আমার এ বিশ্বাস ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ বলে আমাদের সকলের জানা যে ‘চেনা ছক’ আছে তার মধ্যে ঘটনাগুলি ফেলে দেওয়া যায় না। যদি ফেলে দেওয়া যেত তাহলে অনেকেই হিমেল বাতাসের পরশ গায়ে লাগিয়ে বেশ খানিকটা স্বস্তিবোধ করতে পারতেন সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। সমগ্র ঘটনার পিছনে আছে একটি দানবীয় শক্তি যার নাম রাজনীতি। ক্ষমতার রাজনীতি। যা অত্যন্ত আধুনিক। এটি একটি ক্লেদাক্ত তত্ত্ব যা নিজেদের সাময়িক স্বার্থ মেটাবার জন্য ধর্মীয় বা যে কোনো সামাজিক কার্যক্রমকে ব্যবহার করতে ইতস্তত করে না। দাদরি ঘটনাতেও এই রাজনীতি কাজ করেছে। যেমন করেছিল মুজফ্‌ফরনগরের ঘটনায়।

সুতরাং এমনতর ঘটনাগুলিকে সামাজিক রোগ বলে সমগ্র দায়টি সমাজের কাঁধে ফেলে দিয়ে পথ খোঁজাটা নৈতিক দিক দিয়ে অন্যায় হবে। শুধু তাই নয়, নৈতিক অধিকারই নেই। আখলাক হত্যার মীমাংসা সেই কারণে প্রশাসনকে যেমন করতে হবে, রাজনীতিকদের নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথম দায়িত্ব নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। কারণ তিনি রাষ্ট্রের প্রধান। তা ছাড়া যে সংগঠনের তিনি প্রচাক, তারই সভ্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন জঘন্য কর্মে রত। ‘গুরুভাই’দের দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। তাই সামাজিক রোগ বলে অন্তত তিনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর সময় নেই। বেশিরভাগ সময় বাইরে। যতটুকু সময় দেশে থাকেন সেই সময় ঘনঘন পোশাক পরিচ্ছদ পালটাতে, ‘মন কী বাত’ বলতে আর ২/৪টে জনসভায় নাটকীয় ভাষণ দিতেই ফুরিয়ে যায়! প্রধানমন্ত্রীও অস্বীকার করতে পারেন না। আখলাক শহীদ হয়েছে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, যার উত্তর প্রধানমন্ত্রীকেই দিতে হবে।

(৫)

ভারতের শাসন কেন্দ্রে বসে থাকা কেষ্টুবিষ্টুরা অনেকেই মনে করেন দেশের গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, সহনশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল কথার কথা। এগুলোর নাকি বাস্তব জীবনে কোনো মূল্য নেই। আজকে তাদের কাছে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’ পরিণত করার। ইতিহাসের শিক্ষা এবং তার ধারাবাহিকতা তাদের কাছে মূল্যহীন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই এব্যাপারে উৎসাহ পেয়ে যাচ্ছেন তারা। তা নইলে, দাদরির ঘটনাতে প্রধানমন্ত্রী ১৫ দিন পর মুখ খুললেও কড়া নিন্দা করতে পারেননি। দোষীরা শাস্তি পাবে এই সহজ সত্য কথাটি বলতে পারেননি। এমন কি রাষ্ট্রপতির কড়া প্রতিক্রিয়ার পরও তার হেলদোল নেই। বিহারের জনসভার ভাষণ তারই প্রমাণ। এব্যাপারে তিনি যা বলেছেন তাতে ধর্মীয় মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ভারত একটা নানা মত, নানা ধর্ম-বিশ্বাসের দেশ। সব মতের প্রাধান্য এবং মর্যাদা ব্যতিরেকে দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে না। বি জে পি বা আর এস এস-এর লোকরা গায়ের জোরে, লোকসভাতে সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে সব কিছুকে পালটে দিতে চায়। ভারতের সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি বলে চালাতে চায়, এই মিশ্র সংস্কৃতির দেশে সেটা করতে গেলে অনেক রক্ত যে ঝরাতে হবে এবং তা অসম্ভব  – এটা বোঝার মতো সাধারণ বুদ্ধির অভাব হয়েছে হিন্দুত্ববাদীদের।

সম্প্রতি আর একটি ঘটনা সারা দেশের মানুষের নজর কেড়েছে। এক সন্তান সম্ভাবনা মুসলমান মায়ের কথা। সেদিন রাত্রে হঠাৎই মায়ের তীব্র প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। স্বামীটি প্রথমে এটা ওটা করে, ওষুধ দিয়ে ব্যথা কমাবার চেষ্টা করেছে। হয়নি। ব্যথা আরও তীব্র। রাস্তায় নেমেছে তারা। একটু দূরে হাসপাতাল। গন্তব্য সেখানেই। কিন্তু কিছুদূর যাবার পর মা তখন চলৎশক্তিরহিত। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে থাকা বিরাট গণেশ-মন্দিরের চাতালে শুইয়ে দিয়েছে মা-কে। তখন পুণ্যার্থীরা আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মেয়েরা। স্বামীটি তো ভয়ে কাঁটা। কি জানি কি হবে! পুণ্যার্থী মেয়েরা কিন্তু বুঝে গিয়েছে কি হয়েছে এবং কি হতে যাচ্ছে। প্রধান পুরোহিত বাইরে এসে দেখেন এমন কাণ্ড। তিনি তাড়াতাড়ি পুজো দিতে আসা মায়েদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে ভিতরে গেলেন। পুণ্যার্থী মায়েরা তাদের গায়ের ওড়না খুলে অস্থায়ী ‘লেবার রুম’ করে ফেললেন। তার মধ্যে নিয়ে গেলেন মা-কে। স্বামীটি অবাক হয়ে দেখছে। একটু পরেই সদ্যোজাত শিশুর কান্নার শব্দ পাওয়া গেল। পুণ্যার্থী মায়েদের হর্ষধ্বনি। মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠেছে জোরে, আরও। মুসলমান মায়ের সন্তান জন্ম নিল গণেশ মন্দিরে। মন্দিরের বাইরের রাস্তায় পিতা তখন আজান দিচ্ছে সন্তানের জন্য। পরবর্তী ঘটনাটি আরও মজার। পুত্রসন্তান। মা আদর করে তার নাম রেখেছেন ‘গণেশ’

চিরদিন ভারত এই ঐতিহ্য ও সহনশীলতা বহন করে যাচ্ছে। আখলাক হত্যার মতো ঘটনার পরও তা অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে – দেশের শাসকবর্গ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে সেটাকে নষ্ট করতে চাচ্ছে। মাত্র দেড় বছরের শাসনকালে এত দাঙ্গা হবে, এত রক্ত ঝরবে, এত হিংসা ছডিয়ে পড়বে, আগুন জ্বলবে কেউ ভা‍‌বেনি। সামাজিক ক্ষেত্রে এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী কেন্দ্রের সরকার। মানুষের কাছে তাদের জবাবদিহি করার সময় এসেছে।

আবার পুরানো কথাতেই ফিরে আসি। বহুত্ববাদ সারা পৃথিবীতে একটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। মানুষ সেটাকেই জীবন চর্চার মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছে। ধর্ম যদি ক্রমাগত মানুষের পরিচয় নির্দিষ্ট করে দিতে থাকে বা দেওয়ানোর চেষ্টা হয় তাহলে যে কোনো সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হয়ে যাবে। এই অবস্থা নিয়ে একটা সমাজ চলতে পারে না। আমাদের দেশের প্রধান শক্তি হচ্ছে দীর্ঘকাল থেকে ভারতের মাটিতে প্রোথিত এই সহনশীলতা আর ঐক্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান…’। ঝড়-ঝাপ্টা এর উপর দিয়ে বয়ে গেলেও মূল সুরটি এখনও অক্ষত আছে।

সব মানুষের সক্রিয় উদ্যোগ ছাড়া বহুত্ববাদ কার্যকর হতে পারে না। সব অংশের মানুষকে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে দেশের ঐক্য রক্ষার কাজে নিয়োজিত হতে হবে। ভারতের কাছে সেটাই হবে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

Minorities At Crossroads

September 18, 2014

হিন্দুত্ব তার সহনশীল মুখটা হারিয়ে ফেলছে

দেবেশ রায়

শ্রী ফলি এস নরিম্যান বর্তমানে ভারতের শ্রেষ্ঠ আইনজীবীদের একজন৷‌ সাংবিধানিক বিধি ও রীতি সম্পর্কে তাঁর মতামত সারা দেশে গভীর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনা হয়৷‌

১২ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার তিনি দিল্লিতে এক পূর্বনির্ধারিত বক্তৃতা দিয়েছেন৷‌ ‘সংখ্যালঘু জাতীয় কমিশন’-এর বার্ষিক বক্তৃতা৷‌ বিষয় ছিল– ‘সংখ্যালঘুদের পথসঙ্কট: বিচারবিভাগীয় ঘোষণা সম্পর্কে মম্তব্য’৷‌ এই সভার সভামুখ্য ছিলেন শ্রীমতী নাজমা হেপতুল্লা– বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী৷‌

nariman-main

শ্রীমতী হেপতুল্লা কংগ্রেসের নেত্রী ছিলেন ও রাজ্যসভার উপসভামুখ্যও ছিলেন৷‌ গত সাধারণ নির্বাচনে তিনি বি জে পি-তে যোগ দেন৷‌ শ্রীমতী হেপতুল্লা হলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদের নাতনি৷‌ তাঁকে দলে পেয়ে নিশ্চয়ই তাদের সাম্প্রদায়িক পরিচয় একটু হালকা করার সুযোগ পেয়েছিল বি জে পি৷‌ বি জে পি-কে এমন সুযোগ করে দিয়েছেন আরও কয়েকজন মুসলিম নেতা ও বুদ্ধিজীবী৷‌ বি জে পি-তে যোগ দেওয়ার সময়, গত লোকসভা ভোটের আগে, বি জে পি-র অসাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে তাঁদের নতুন বোধোদয়কে তাঁরা প্রচার করেছিলেন৷‌ বি জে পি-ও কাজে লাগিয়েছিল৷‌

শ্রী নরিম্যানের বক্তৃতায় সাম্প্রতিকতম রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার ধারণার এমন তরলতা সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বকে যেমন অনিশ্চিত করে তুলছে সেই কথাটাই প্রধান হয়ে উঠেছে৷‌ সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে তো অনেক কথাই হয় ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী যে-কোনও যুক্তিই মান্য৷‌

কথাটা আবারও বলছি– সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে কোনও যুক্তিই মান্য৷‌

এই কথাটির আড়ালে আর একটি কথা আছে যা সমান সত্য৷‌ সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে কোনও যুক্তির আভাসও গ্রাহ্য নয়৷‌

শ্রী নরিম্যান ঠিক এই জায়গাটিতেই পৌঁছেছেন তাঁর এই বক্তৃতায়৷‌

পৌঁছেছেন তাঁর দীর্ঘ জীবনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার জোরে, যাকে আমরা প্রাজ্ঞতা বলি৷‌ পৌঁছেছেন ভারতের সংবিধানের ভিত্তি তৈরি করেছে যে রাজনৈতিক দর্শন সে সম্পর্কে তাঁর বৃত্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে৷‌ পৌঁছেছেন– সংখ্যালঘুদের সসম্মান নিরাপত্তার আইনি বাধ্যতা সম্পর্কে তাঁর সচেতনতা থেকে৷‌

এই প্রাজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা তাঁর এই বক্তৃতাটিকে এমন দৃঢ়তা দিয়েছে৷‌ পি টি আই এই বক্তৃতাটি প্রচার করেছে৷‌ পুরো বক্তৃতাটিই প্রায় প্রত্যেকের অবশ্যপাঠ্য৷‌ আমি এখানে তাঁর কথা দিয়েই প্রধানত তাঁর বক্তব্যের যুক্তিটা সাজানোর চেষ্টা করছি৷‌ যাঁরা চাইবেন তাঁরা  পুরো বক্তৃতাটিই কম্পিউটারে পড়ে নিতে পারবেন এইখানে ক্লিক করে।

শ্রী নরিম্যান তাঁর বক্তৃতা শুরু করেন এই বলে– কেন্দ্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনকে তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন ‘কিন্তু ভয়ে-ভয়ে, অতীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারদের সংখ্যাগুরুবাদের (‘মেজরিটেরিয়ানইজম’) প্রতি পক্ষপাত আমি লক্ষ্য করেছি৷‌’

ভারতের সব ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে ‘হিন্দুধর্মের ঐতিহ্যে সহনশীলতা সবচেয়ে লক্ষণীয়৷‌ কিন্তু সাম্প্রতিক কালে উন্মার্গতা ও ঘৃণাগর্ভ বক্তৃতাবাজি দিয়ে উসকোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অবিরল ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে হিন্দুদের সহনশীলতার ঐতিহ্যের ওপর ক্রমেই চাপ তৈরি করা হচ্ছে৷‌ এবং আমাকে খোলাখুলি বলতে দিন যে হিন্দুত্ব (শ্রী নরিম্যান নিজেই এই শব্দটির নিচে দাগ দিয়েছেন) ক্রমেই তার সহনশীল মুখটা হারিয়ে ফেলছে৷‌ তার কারণ ও একমাত্র কারণ, এমন কথা বিশ্বাস করা হচ্ছে ও গর্ব করে বলাও হচ্ছে (মাথার ওপরে যাঁরা আছেন, তাঁরা কেউ এই সব কথার কোনও প্রতিবাদও করছেন না) যে হিন্দুত্বের জোরেই (শ্রী নরিম্যান নিজেই ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটি বড় হরফে লিখেছেন) তাঁরা শাসনক্ষমতা দখল করতে পেয়েছেন৷‌ আমরা রোজ-রোজ টেলিভিশনে দেখছি ও খবরের কাগজে পড়ছি, কোনও-কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দেশের কোনও-কোনও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিগির তুলছেন৷‌ এই সব জিগির নিয়ে অনেকেই বলছেন যে কেন্দ্রীয় সরকার এ-সব বন্ধ করার কোনও চেষ্টাই করছে না৷‌ আমি তাঁদের সঙ্গে একমত৷‌’

বি জে পি এম পি যোগী আদিত্যনাথ নির্বাচনী সভাগুলিতে পরপর যা সব বলেছেন তার জন্য নির্বাচন কমিশন তাঁকে তিরস্কার করেছে, তাঁকে হুঁসিয়ারি দিয়েছে ও তাঁর বিরুদ্ধে এফ আই আর করার নির্দেশ দিয়েছে৷‌ আর এস এস-এর প্রধান মোহন ভাগবত ভারতকে ‘হিন্দুজাতির বাসস্হান’ বলে বর্ণনা করেছেন৷‌ নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতালাভের পর সঙঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত অনেক রাজনৈতিক নেতা অনেক উত্তেজক কথা বলছেন৷‌

‘সংখ্যালঘু জাতীয় কমিশনের প্রধান কাজ সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষা করা৷‌ সে কাজ তারা করছে না৷‌ সরকার মাত্রই তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী কিছু কাজ করে ও কিছু কাজ করে না৷‌ সেই কারণেই পার্লামেন্ট স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংখ্যালঘু কমিশন তৈরি করেছে৷‌ কমিশনের প্রধান কাজ সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষা৷‌ যদি কোনও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে প্রতিদিন আক্রমণ করা হয়, নিন্দে করা হয়, ঠাট্টা করা হয়, মানহানিকর ভাষায়, তা হলে তাদের স্বার্থরক্ষা হবে কীভাবে? এর উত্তর হল– এদের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ও ফৌজদারি আইনবিধির ব্যবস্হা প্রয়োগ করে৷‌ অন্যথায় এই কমিশন সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার প্রধান কর্তব্যটিই পালন করতে পারবে না৷‌

‘যাঁরাই ঘৃণা ছড়িয়ে বক্তৃতা করবেন, তাঁদেরকে কোর্ট-এর বিধিব্যবস্হা দিয়ে প্রতিহত করতে হবে৷‌ সেই উদ্যোগ নিতে হবে সংখ্যালঘু কমিশনকে৷‌ কারণ, এই সংগঠনই সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষার আইনি সংগঠন৷‌ যাঁরাই এমন ঘৃণা ছড়াবেন, তিনি যে সম্প্রদায়েরই হোন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্হা নিয়ে তাঁকে আটকাতে হবে ও সেই আইনি ব্যবস্হার কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে৷‌’

সুপ্রিম কোর্ট বহুবার সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষা করেছে ও তারা ‘সুপার সংখ্যালঘু কমিশন’-এর মতো কাজ করেছে৷‌ কিন্তু ১৯৯০-এ বি জে পি যখন জাতীয় রাজনীতিতে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’ এই শব্দ ব্যবহার শুরু করে তখন থেকেই বিচার ও আইনের ব্যাখ্যায় কিছু বদল লক্ষ্য করা গেছে৷‌’

‘ওই লেবেলটা সেঁটে গেছে৷‌ সংখ্যালঘু শব্দটি ক্রমে একটা অপ্রিয় শব্দ হয়ে ওঠে৷‌ ও উঠেছে৷‌ সেই একই রাজনৈতিক দল তাদের মে-জুন ১৯৯১-এর নির্বাচনী ইস্তাহারে এ-কথা বলে যে তারা যখন ও যদি ক্ষমতায় আসে, তা হলে তারা সংবিধানের ৩০ সংখ্যক বিধি সংশোধন করবে৷‌ তার ফলে, সংখ্যালঘুদের অধিকার আইন কর্তৃক রক্ষিত হওয়ার সুবিধে অনেক কমে যাবে ও সুপ্রিম কোর্টও সংখ্যালঘুদের অধিকার আর তেমন রক্ষা করতে পারবে না৷‌

এমন বক্তৃতার পর শ্রী নরিম্যানকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেন– ‘ঘৃণা প্রচার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য নিয়ে মন্ত্রী কি কিছু বললেন?’ শ্রী নরিম্যান উত্তর দেন, ‘সেটা ওঁকে জিজ্ঞাসা করুন৷‌’

সভার শেষে সভামুখ্যের ভাষণে সংখ্যালঘু মন্ত্রী নাজমা হেপতুল্লা বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি সরকারের নীতি হল– ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’৷‌ পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, মুসলিমদের ন্যায় ও যুক্তিসঙ্গত অধিকার রক্ষার জন্য বি জে পি-র নির্বাচনী ইস্তাহারে যা বলা হয়েছে তা পূরণ করতে হবে৷‌’

শ্রী নরিম্যান সেই ইস্তাহার নিয়েই তো প্রশ্ন তুলে দিলেন৷‌ স্হানীয় ভাবে মুসলিম মহল্লাগুলিতে ও যেখানে সম্ভব সেখানেই শ্রী নরিম্যানের বক্তৃতাটি ছেপে বিলি করা যায় না? পত্র-পত্রিকাতেও ছাপা যায় না?

Is Mamata a Fascist?

April 29, 2013

ফ্যাসিবাদের অপচ্ছায়া

প্রভাত পট্টনায়েক

ফ্যাসিবাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত যে কোন ব্যক্তির পক্ষেই নরেন্দ্র মোদীকে একজন ফ্যাসিবাদীরূপে অভিহিত করা এবং মোদী পরিচালিত বি জে পি ঢক্কানিনাদকে স্বাধীনোত্তর ভারতে প্রথম ফ্যাসিবাদী দখলদারির এক নির্লজ্জ অপচেষ্টারূপে চিহ্নিত করা আদৌ কষ্টকর নয়। গুজরাটে ২০০২ সালের মুসলিম-বিরোধী সুসংগঠিত হত্যালীলা ও লুণ্ঠনের প্রধান কারিগরই ছিলেন মোদী। তিনি এসেছেন সেই আর এস এস-র বাহিনী থেকে, যে আর এস এস-র কেন্দ্রীয় লক্ষ্যই হলো অনস্বীকার্যভাবে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও নিঃসন্দেহে সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী। অধিকন্তু, লগ্নিপুঁজির শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সংযোগ রয়েছেন এবং তাদের অ্যাজেন্ডাকেই তিনি খোলাখুলি অগ্রাধিকার দিয়েছেন যা কিনা এক ফ্যাসিবাদী জমানার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান

নয়‌া উদারনীতির মানবিক মুখ?

ফ্যাসিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবিরোধী বাগাড়ম্বরসহ এক পেটি বুর্জোয়া আন্দোলনরূপে শুরু হলেও ক্রমশ সেই অগ্রগণ্য পুঁজিপতিদের সঙ্গে সংহতি গড়ে তোলে (এবং তাদের অর্থে পুষ্ট হয়), যারা এই আন্দোলনকে অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর প্রতিবন্ধকতাহীন কর্তৃত্ব কায়েম করার এক যন্ত্ররূপে খুঁজে পায়। (জর্জি ডিমিট্রভ তাঁর ‘দ্য ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ গ্রন্থে বস্তুতপক্ষে এই ঘটনাকেই ‘‘লগ্নিপুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল এবং সবচেয়ে হিংস্র প্রতিহিংসাপরায়ণ অংশের প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র’’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন।) মোদী বর্তমানে সেই পর্যায়ে বিরাজ করছেন, লগ্নিপুঁজির অগ্রগণ্য অংশ এবং কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যমের সহায়তায় নিজেকে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীরূপে জাহির করছেন এবং তাঁর উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সংহতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির সম্মতি আদায়ের জন্যও সচেষ্ট রয়েছেন।

তিনি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এফ ডি আই-র সমর্থক, তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বেসরকারীকরণের প্রবক্তা। তথাকথিত যে ‘‘উন্নয়নের গুজরাট মডেল’’-র তিনি উৎসাহদাতা, তা কিন্তু সাধারণ জনগণের উন্নয়নের জন্য কোনও উৎকণ্ঠা থেকে নিঃসৃত নয় (মানবোন্নয়নের প্রায় সবকটি মাপকঠিতেই গুজরাট অন্যান্য রাজ্যগুলির তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে), বরং তা পরিচালিত হচ্ছে যা-খুশি-তাই করার জন্য কর্পোরেটদের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার দ্বারা। এ হলো কোন প্রকার মানবিক মুখের ভণ্ডামি রহিত নয়া উদারনীতি।

প্রকারান্তরে একথা বলা যায়, ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞাস্বরূপ দু’টি মূলশর্ত তিনি পূরণ করছেন। এক : তার ‘শ্রেণী চরিত্র’, যা কিনা তার পেটি বুর্জোয়া উৎস সত্ত্বেও আগ্রাসীভাবে কর্পোরেটদের অনুসারী। দুই : তার ‘গণ-চরিত্র’, যার উৎস হলো উগ্র ‘জাতীয়তাবাদ’, উৎকট জাত্যভিমান, জাতি-বিদ্বেষ এবং কিছু দুর্ভাগা সংখ্যালঘুকে জনগণের সমস্ত দুর্দশার কারণরূপে জড়িয়ে দেওয়ার জিগির। (তাঁর ক্ষেত্রে এই ‘গণচরিত্র’-র উৎস হলো ক্ষিপ্ত হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা)।

যেক্ষেত্রে মোদীকে ফ্যাসিবাদীদের তালিকায় স্থান দেওয়া নিয়ে তেমন কোন মতপার্থক্যের অবকাশ নেই। (একই কথা শিবসেনার বিভিন্ন বর্তমান অবতারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যদিও সম্মিলিতভাবে তারা সাম্প্রতিককালে দম হারিয়েছে)।

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারতের রাজনৈতিক মঞ্চের আর একজন বেমানান অভিনেতা মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস (টি এম সি)-কে শ্রেণীভুক্ত করার ক্ষেত্রে। নিঃসংশয়ে তিনি অন্তর থেকে একজন স্বৈরাচারী। কিন্তু তিনি কি একচেটিয়া পুঁজিপতিদের বিরোধী নন? তিনি কি বহু ব্র্যান্ডের খুচরো ব্যবসায়ে বহুজাতিকদের প্রবেশাধিকারের বিরোধিতা করেননি এবং সেই প্রশ্নে এমনকি ইউ পি এ সরকার থেকেও বেরিয়ে আসেননি? বামপন্থীদের সম্পর্কে অন্তঃস্তল থেকে ঘৃণা পোষণ করলেও তিনি বহু বিষয়ে বামপন্থীদের সুরেই কথা বলছেন এমনটা কি মনে হয় না? তাহলে কীভাবে তাঁকে একচেটিয়া পুঁজিপতিদের প্রিয়পাত্র মোদীর সঙ্গে একই আসনে স্থান দেওয়া যায়?

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্যাসিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবিরোধী এক আন্দোলন রূপেই তার যাত্রা শুরু করেছিলো। নিজের মূল বাগাড়ম্বরের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং নিজের বাহিনীকে নির্মমভাবে নিধন করেই একচেটিয়া পুঁজির দিকে তার পক্ষ পরিবর্তন ঘটেছে। জার্মানির ক্ষেত্রে এই নিধনযজ্ঞ ছিলো হিটলারের একদা ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ও সহযোগী আর্নস্ট রোহম এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন এস এ বাহিনী (নাৎসি ঝটিকা বাহিনী)-র বিরুদ্ধে ‘নাইট অব লং নাইভ্‌স’ নামে কুখ্যাত সময়কালে। এই বিশ্বাসঘাতকতাটা ঘটেছিলো সেই সময়কালে যখন নাৎসিরা জাতীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছিলো, যখন বিরোধী অবস্থানে থাকাকালে যে মূল পুঁজিবাদ-বিরোধী বাগাড়ম্বর তাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে তাকেই ক্ষমতা দখলের অর্থ জোগানদার লগ্নিপুঁজির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার স্বার্থে বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলো এবং যখন তাদের ক্ষমতায় আসতে সাহায্যকারী জার্মান সেনাবাহিনীর সমর্থন নাৎসি পরিকল্পনাগুলির রূপায়ণের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়লো, যে কাজে এস এ বাহিনী ছিলো অপ্রতুল।

ফ্যাসিবাদের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে যেসব লক্ষণ

এ ধরনের কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের কোন কোন নির্দিষ্ট সময়ে পুঁজিবাদ-বিরোধী বাগাড়ম্বর তাই স্বতঃসিদ্ধভাবে তেমন প্রণিধানযোগ্য নয়। মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর টি এম সি-র ক্ষেত্রে অবশ্যই বেশ কিছু ফ্যাসিবাদী লক্ষণযুক্ত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো : এক অস্বাভাবিক স্বৈরাচারী মনোভাব, এক নির্মম বাসনা—তা কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিরোধী বিশেষ করে কমিউনিস্টরাই নয়, গোটা নাগরিকসমাজসহ যে কোন মহল থেকেই ব্যক্ত সমস্ত প্রতিবাদের কণ্ঠরোধের জন্য কঠোর হাতে ব্যবস্থা গ্রহণের বাসনা। প্রতিবাদ এবং সেই অর্থে যেকোন সমালোচনামূলক চিন্তারই কণ্ঠরোধ করার সেই বাসনার লক্ষণ ধরা পড়ছে ছাত্রসংসদের নির্বাচন নিষিদ্ধ করার বাসনার মধ্যে, যার লক্ষ্য হলো যে ছাত্ররা সমাজের সবচেয়ে আদর্শবান, দুর্নীতিমুক্ত এবং চিন্তাশীল অংশরূপে গণ্য হয় তাদেরকে যে কোন সমালোচনামূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো : অর্থনৈতিক প্রশ্নে একদিকে পরিবর্তনপন্থী কথা বলা, একই সঙ্গে শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রাম, ধর্মঘট এবং অধিকারের বিরোধিতা। এ হলো এমন এক পরিবর্তন পন্থা, যাকে কেবলমাত্র দক্ষিণপন্থী পরিবর্তনপন্থা নামেই অভিহিত করা যায়। এই দক্ষিণপন্থী পরিবর্তনপন্থার চরিত্র হলো বিরোধী অবস্থানে থাকাকালীন, নিদেনপক্ষে জাতীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পূর্বেকার ফ্যাসিবাদী চরিত্র। যখন তারা এই কাজে সফল হবে, এই দক্ষিণপন্থী পরিবর্তনপন্থার বদলে দেখা দেবে লগ্নিপুঁজির পুরোধাদের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড় সংহতি। (জার্মানিতে দক্ষিণপন্থী পরিবর্তনপন্থা থেকে অগ্রগণ্য কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে আঁতাতে পরিবর্তন বিশেষভাবে তীক্ষ্ণ ছিলো, কারণ রোহমের এস এ কিছু শ্রমিক-দরদী কথা বলতো, কিছু ধর্মঘটকে সমর্থন করেছিলো এবং ধর্মঘট ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের পথ নিয়েছিলো)।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো : কেবলমাত্র জনজীবনের অধিকার নয়, এমনকি সাংবিধানিক অধিকারের প্রতিও সার্বিক অমর্যাদা। পুলিসী হেফাজতে সুদীপ্ত গুপ্ত’র মৃত্যুর ঘটনায় উচিত ছিলো জনগণের আস্থাভাজন এক তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা এবং সেই তদন্তের রিপোর্ট চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোন মন্তব্য করা থেকে মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীদের বিরত থাকাটাই উচিত ছিলো। মুখ্যমন্ত্রী কর্তৃক কোন বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের নির্দেশ না দেওয়া (পুলিসী হেফাজতে মৃত্যুর তদন্তের দায়িত্ব পুলিসের হাতেই ন্যস্ত করলে তার কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না), এবং মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিসের বয়ানকেই সত্য হিসাবে তাড়াহুড়ো করে জাহির করার ঘটনা জনজীবনের অধিকারবোধকে সম্পূর্ণভাবে অবজ্ঞা করার দিকেই ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু এটাই সব নয়। রাজ্য সরকার স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বর্তমানে এক সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, এমনকি এই অভিযোগও উত্থাপন করেছে যে এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কমিশন সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে এই আইনী লড়াইয়ের খরচ মেটাতে সেই সরকারকেই বাধ্য করছে!

এই ঘটনা সাংবিধানিক অধিকারবোধের প্রতি এক চরম তাচ্ছিল্যেরই নিদর্শন। রাজ্য নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্থাপিত একটি প্রতিষ্ঠান, স্বাভাবিকভাবেই এর নিজস্ব কোন আয় নেই, থাকা উচিতও নয়। সরকারী কোষাগার থেকেই এর খরচের দায় মেটাতে হয়। কমিশন যদি আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে, তবে সেই আইনি খরচও সরকারকেই বহন করতে হবে, কোনও প্রশ্ন না তুলেই এবং কে তার আইনি প্রতিপক্ষ সেই প্রশ্ন বিচার না করেই। এইসব খরচ সম্পর্কে অভিযোগ তোলা কেবলমাত্র সংবিধানকে লঙ্ঘন করাই নয়, বস্তুতপক্ষে সরকারী অর্থকে রাজ্য সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে গণ্য করা এবং যেকোন খরচকেই রাজ্য সরকারের দয়ার দাক্ষিণ্য বিতরণ মনে করারই শামিল।

ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব বা ফ্যাসিবাদের আদি রূপ

লুম্পেন প্রলেটারিয়েতের ন্যায় আচরণ করে এরকম রাজ্য সরকারের অস্তিত্ব বলতে গেলে ভারতে এখন এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সংবিধান সম্পর্কে রাজ্য সরকারের উপলব্ধিটা যদি লুম্পেন প্রলেটারিয়েতদের উপলব্ধি থেকে উন্নত না হয় এবং এই উপলব্ধিটাকেই যদি সত্য বলে প্রকাশ্যে জাহির করা হতে থাকে, তবে তা সংবিধানের উপরেই এক স্বৈরাচারী আঘাতরূপে দেখা দেয়। সংবিধানের কোন না কোন ধারা সম্পর্কে অসন্তোষ অথবা সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ উপায়ে এই ধারা পরিবর্তনের প্রচেষ্টার সুস্পষ্ট বিপরীত এই আঘাত ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো : অনেক লেখক, বিশেষ করে মার্কসবাদী ঘরানার বাইরের লেখকগণ যেরকম বলে থাকেন, একনেতা-কেন্দ্রিকতা, যা কিনা ফ্যাসিবাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যে কিনা প্রতিষ্ঠান এবং আইনের গুরুত্বকে খাটো করে এবং এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টিকে অনুমোদন করে যেখানে রাজ্যের ফ্যাসিবাদী পার্টির নিচের তলার অতিউৎসাহী যা-ইচ্ছা-তাই করনেওয়ালা কর্মীরা ভয়ঙ্কর বাড়াবাড়ি ঘটাবার সুযোগ পায়। (অনেকে নাৎসি জমানার গণহত্যার জন্য ফুয়েরার-এর প্রভাব ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠানগুলির সার্বিক অবনয়নকেই দায়ী করে থাকেন)। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গে একজন ব্যক্তির চরম কেন্দ্রিকতা প্রকট হয়ে উঠেছে। ফলস্বরূপ, সুদীপ্ত গুপ্ত’র মৃত্যুর ন্যায় হৃদয়বিদারক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘নেত্রী’ যে চূড়ান্ত চিন্তাহীন ও রুচিহীন মন্তব্য করেছেন তার সাফাই গাইতে টি এম সি-র বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হতে দেখা গেছে।

এইসব প্রণিধানযোগ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকট হয়ে ওঠা সত্ত্বেও ঘটনা হলো, এই জমানা এবং একচেটিয়া পুঁ‍‌জির মধ্যে এখনও সেতুবন্ধন স্থাপিত হয়নি। উপরন্তু তার ‘গণ’ চরিত্র গঠনকল্পে কোনও সংখ্যালঘু সামাজিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চরম জাত্যভিমান এখনও জাগিয়ে তোলা হয়নি। এটাকে বলা যায় নির্মীয়মাণ ফ্যাসিবাদ অথবা ফ্যাসিবাদের আদিমরূপ অথবা ‘নাইট অব লং নাইভ্‌স’র পূর্বেকার ফ্যাসিবাদ। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাকে একচেটিয়া পুঁজির দ্বারা পৃষ্ঠপোষিত পরিপূর্ণ ফ্যাসিবাদ বলা যায় না।

কিন্তু তাহলে কিছু ব্যক্তি-নেতা এবং দল ফ্যাসিবাদী বা ফ্যাসিবাদী নয় এ ধরনের শ্রেণীভুক্তিকরণের এই সমগ্র আলোচনাটাই অর্থহীন হয়ে ওঠে। ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার যে কাঠামো সেখানে কোন একটি নির্দিষ্ট রাজ্যের একটি রাজনৈতিক দল এবং তার নেতা জাতীয় ক্ষেত্রে মমতার আস্ফালনকারী এক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কাছে উপযোগী হয়ে উঠতে পারে এবং তার ছোট শরিক হিসাবে কাজ করতে পারে, অবিকল চরিত্রের না হয়েও তার অপরাধমূলক কাজকর্মের সঙ্গী হওয়ার মধ্য দিয়ে। কমিউনিস্টদের দমন করার কাজে কৃতিত্ব তাকে কেন্দ্রে আসীন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারে। ফ্যাসিবাদীদের বিবেচনা এই ‘ভালো কাজ’-এর সুবাদে লগ্নিপুঁজি তাকে অব্যাহত রাখার জন্য কিছু পরিমাণ অর্থও বরাদ্দ করতে পারে।

অন্যভাবে বলা যায়, একটি সংগঠন ফ্যাসিবাদের ধ্রুপদী চরিত্র না হয়েও রাজ্যস্তরে ক্ষমতাসীন থেকে যদি বামপন্থীদের দমন করার কাজে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, তবে সেইভাবেও ফ্যাসিবাদী-কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যকে ভা‍লোভাবেই চরিতার্থ করতে পারে। দিগন্তে ঘনায়মান এই ফ্যাসিবাদী প্রেতচ্ছায়ার বিরুদ্ধেই বামপন্থীদের লড়াই করতে হবে।

If Wishes Were Horses…

July 6, 2012