Posts Tagged ‘urdu’

Honour 1953 Agreement On J&K

May 17, 2016

কাশ্মীরঃ ১৯৫৩ সালের চুক্তি পুনর্বহাল করতে হবে

220px-Kuldip_Nayar-2

কুলদীপ নায়ার

কাশ্মীর এখন স্বাভাবিক। কথাটা এই অর্থে বলা যায় কারণ, সেখানে আমরা পাথর নিক্ষেপের ঘটনা দেখিনি। জঙ্গিবাদও শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। কিন্তু তারপরও এই উপত্যকার মানুষের মনে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। সেখানে পা দেওয়ামাত্র আপনি এটা বুঝতে পারবেন। এর জন্য অনেক কারণই দায়ী। তবে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কাশ্মীরিদের মনে সাধারণভাবে এই বোধ সৃষ্টি হয়েছে যে ভারত কাশ্মীরের সবকিছুর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যদিও কাশ্মীর তাকে স্রেফ তিনটি জিনিসের নিয়ন্ত্রণ দিয়েছিল: প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ।
এই অভিযোগের যৌক্তিকতা আছে। কারণ, রাষ্ট্রের একটি অংশ কেন্দ্রের কাছে কতটা সার্বভৌমত্ব সমর্পণ করবে, সেটা তার ওপরই নির্ভর করে। ফেডারেশন নিজে থেকে কিছু নিতে পারে না। কিন্তু নয়াদিল্লি ঠিক এ কাজটিই করেছে। জওহরলাল নেহরু ও শেখ আবদুল্লাহ ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, এ কারণেই তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়েছিল। শেখ ১২ বছর অন্তরীণ ছিলেন। তবে নেহরু নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, আর তা শোধরানোর জন্য তিনি শেখকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এনে রেখেছিলেন।
নয়াদিল্লি ও শ্রীনগরের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে ঠিক একই কারণে। কথা হচ্ছে, একজন মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে একই সঙ্গে কেন্দ্রের সুনজরে থাকবেন, আবার উপত্যকাবাসীর মনে এই অনুভূতি সৃষ্টি করবেন যে তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। এই চিন্তায় বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোর ঘুম হারাম হয়ে যায়।
যাঁরা কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মনে করেন, তাঁরা ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারা মুছে দিতে চান। এঁরা একদিকে যেমন ভারতীয় সংবিধানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, তেমনি অন্যদিকে কাশ্মীরিদের সঙ্গেও। দুঃখজনকভাবে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির চিন্তা একটু ভিন্ন, যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন পর্যন্ত এমন কিছু করেননি, যা কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন খাটো করতে পারে। কিন্তু এই উপত্যকার সর্বত্রই ভয় জেঁকে বসেছে
সে কারণেই কাশ্মীরের ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যাঁরা একসময় কাশ্মীরের স্বাধীনতার ডাকে সামান্যই সাড়া পেতেন, তাঁরা কিন্তু এখন ভালোই সাড়া পাচ্ছেন। আর তাঁদের অনুসারীদের সংখ্যা যে দিনের পর দিন বাড়ছে, তাতে বিস্ময়েরও কিছু নেই।
নয়াদিল্লিকে এটা বুঝতে হবে, কাশ্মীরিরা যে ভারতের কাছ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে চাইছে, তার মানে হয়তো এই নয় যে তারা নয়াদিল্লির কাছ থেকে শ্রীনগরের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ভাবছে। তারপরও কাশ্মীরিরা নিজেদের শাসন করছে—এমন একটি আবহ বজায় রাখতে হবে। মহারাজা হরি সিংয়ের পর শেখ আবদুল্লাহ রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শাসন চালু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পার্টি নয়াদিল্লির খুব ঘনিষ্ঠ প্রমাণিত হওয়ায় রাজ্যসভায় হেরে গিয়েছিল।
পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি জিতেছিল, কারণ এর প্রতিষ্ঠাতা মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ নয়াদিল্লি থেকে দূরে ছিলেন, যদিও বিচ্ছিন্ন হননি। কাশ্মীরিরা তাঁকে ভোট দিয়েছিল, কারণ তিনি তাদের মনে নয়াদিল্লির বিরুদ্ধাচরণের অনুভূতি সৃষ্টি করেছিলেন। ওমর ফারুক আবদুল্লাহকেও শেখের পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল একই কারণে। ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সম্পর্ক খুবই নিবিড়, ফলে তারা তাকে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের বাইরে গিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে না। কিন্তু বিরোধীরা তারপরও কাশ্মীরবাসীর মনে দিল্লি বিরোধিতার অনুভূতি বয়ে আনছে।
লর্ড সিরিল র‍্যাডক্লিফ কাশ্মীরকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তিনি ছিলেন লন্ডনের একজন বিচারক, যিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমারেখা টেনে দুটি পৃথক দেশের সৃষ্টি করেছিলেন। বহু বছর পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে বলেছিলেন, কাশ্মীর যে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেটা তিনি বুঝতেই পারেননি।
কয়েক সপ্তাহ আগে শ্রীনগরে এক উর্দু ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার সময় আমি এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছিলাম। উর্দুকে অনেক রাজ্য থেকেই শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, এমনকি পাঞ্জাব থেকেও, যেখানে এটি কিছুদিন আগেও প্রধান ভাষা ছিল। বস্তুত, পাকিস্তান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পরই ভাষাটি ভারতে গুরুত্ব হারিয়েছে।
নয়াদিল্লি যে এই ভাষাটির সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে, এ ব্যাপারে কাশ্মীরবাসীর মনে গভীর দুঃখবোধ রয়েছে। সাধারণভাবে ধারণা করা যায়, ভাষাটি অযত্ন ও অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে, কারণ এটিকে মুসলমানদের ভাষা বলে মনে করা হয়। নয়াদিল্লি যদি উর্দু ভাষাকে নিজের মনে করত এবং এর চর্চাকে উৎসাহিত করত, তাহলে কাশ্মীরবাসীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার একটি কারণ অন্তত কমে যেত।
ভারতের বাকি জনগণের মতো কাশ্মীরবাসীও গরিব, তাদের চাকরির দরকার। তারা মনে করে, শুধু উন্নয়নের মধ্য দিয়েও এটা সম্ভব, তার সঙ্গে আছে পর্যটন। কিন্তু তারা জঙ্গিদের তাড়ানোর জন্য বন্দুক বা অন্য কোনো অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে না। প্রথমত, তারা জঙ্গিদের ভয় করে। দ্বিতীয়ত, তারা মনে করে, এই জঙ্গিরা তাদের একটি পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে তারা যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে না, তার কারণ হচ্ছে, এটা তাদের স্বাভাবিক বিচ্ছিন্নতাবোধেরই অংশ।
কয়েক বছর আগে কাশ্মীরে যে প্রলয়ংকরী বন্যা হয়েছিল, তারপর নয়াদিল্লি উপত্যকাটির জন্য প্যাকেজ দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল, তারা সেটা দেয়নি। ব্যাপারটা দুঃখজনক। গণমাধ্যমও এই কথা ভঙ্গের সমালোচনা করেনি। নেতারাও কিছু বলেননি। ফলে কাশ্মীরবাসী মনে করে, এটা নয়াদিল্লির দায়সারা কথা ছিল
আমি এখনো বিশ্বাস করি, ১৯৫৩ সালের চুক্তিতে যে ভারতকে কাশ্মীরের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটা এখনো এই উপত্যকার পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে পারে। কাশ্মীরের তরুণেরা রাজ্যের মর্যাদা নিয়ে ক্ষুব্ধ, ফলে তাঁদের জয় করার জন্য এই নিশ্চয়তা দেওয়া যেতে পারে যে পুরো ভারতের বাজার তাদের জন্য উন্মুক্ত।
কিন্তু শুধু এতেই যে কাজ হবে, এমনটা মনে হয় না। নয়াদিল্লিকে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া আর অন্য সব ক্ষেত্রে জারি করা বিধান বাতিল করতে হবে। ২৫ বছর আগে যে বিশেষ ক্ষমতা আইন জারি করা হয়েছিল, সেটা এখনো বলবৎ আছে। সরকার যদি এটা প্রত্যাহার করে, তাহলে যেমন কাশ্মীরিরা শান্ত হবে, তেমনি অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনী আরও দায়িত্বশীল হবে।
মানুষ তো মনের শান্তি চায়। কাশ্মীরিদের অবশ্যই মনে করতে হবে যে তাদের পরিচয় আক্রমণের মুখে পড়েনি, সেই সঙ্গে নয়াদিল্লিকেও কাশ্মীরিদের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে হবে। আর ১৯৫৩ সালের চুক্তি পুনর্বহাল করা হলে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটতে পারে, তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
Advertisements